জ্যাকেটে পরমাণু বোমা ভরে ‘ফিদায়েঁ’ হামলার ছক! বিশ্বের ক্ষুদ্রতম আণবিক বোমায় যুক্তরাষ্ট্রকে সাজা দেবে ইরান?
‘ফিদায়েঁ’ পরমাণু হামলা চালাতে আণবিক অস্ত্রবোঝাই বিশেষ ধরনের জ্যাকেট তৈরি করছে ইরান। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের এ-হেন বিস্ফোরক মন্তব্যে দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।
বিস্ফোরকভর্তি জ্যাকেট পরে ‘আত্মঘাতী’ হামলা। এই কায়দায় আক্রমণ শানিয়ে বার বার খবরের শিরোনামে এসেছে দুনিয়ার একাধিক কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন। কারা নেই তাতে! আল-কায়দা, লশকর-এ-ত্যায়বা, জইশ-ই-মহম্মদ থেকে ইসলামিক স্টেট বা দায়েশ। কিন্তু, তাই বলে ‘ফিদায়েঁ’ পরমাণু হামলা? এই আশঙ্কায় এ বার বিশ্ববাসীকে সতর্ক করলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স।
সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাসভবন তথা কার্যালয় ‘হোয়াইট হাউসে’ বসে মন্ত্রিসভার বৈঠক। সেখানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন ভান্স। তাঁর দাবি, আত্মঘাতী আণবিক হামলা চালাতে বিশেষ ধরনের জ্যাকেট তৈরি করছে তেহরান। ফলে ‘ফিদায়েঁ’ আক্রমণ হলে, দু’-এক জন নয়, মৃত্যু হবে কয়েক হাজার মানুষের।
ভান্সের কথায়, ‘‘ওরা (ইরান) জ্যাকেট পরে ভিড়ে ঠাসা সুপারমার্কেটে ঢোকে। তার পর, আচমকা বিস্ফোরণে কয়েক জনকে হত্যা করে ফেলে। কিন্তু ভেবে দেখুন, একই কায়দায় যদি পরমাণু হামলা হয়? তখন কিন্তু আর দু’-তিন জনের প্রাণ যাবে না। বরং, নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে কয়েক হাজার।’’ তেহরানের সেই পরিকল্পনা আছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
সাবেক সেনাকর্তাদের বক্তব্য, ভান্সের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার নয়। কারণ, বর্তমানে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পরমাণু বোমা রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। বিশেষ ভাবে নির্মিত সুটকেস বা অ্যাটাচি কেসে রেখে এর বিস্ফোরণ ঘটানো যায়। ফলে, সেই ফর্মুলা মেনে ‘আত্মঘাতী’ আণবিক হামলার জন্য জ্যাকেট বা ভেস্ট যে ইরানি সামরিক গবেষকেরা তৈরি করতে পারেন, তা বলাই বাহুল্য।
গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) সঙ্গে ‘ঠান্ডা যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা। ওই সময় অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে দুই ‘সুপার পাওয়ার’। পরমাণু হাতিয়ারও তার মধ্যে বাদ ছিল না। ১৯৫৮-’৫৯ সালে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম আণবিক ‘ওয়ারহেড’ তৈরিতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। তবে, এর নকশা তৈরি একেবারেই সহজ ছিল না।
আরও পড়ুন:
১৯৬১ সাল নাগাদ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সাফল্য পায় আমেরিকা। বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পরমাণু বোমার নাম রাখা হয় ‘ডব্লিউ৫৪’। সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, সেটা ছিল একটা কৌশলগত আণবিক হাতিয়ার। মাত্র ২৩.১৩ কেজি (প্রায় ৫১ পাউন্ড) ওজনের সংশ্লিষ্ট ‘ওয়ারহেড’টির দৈর্ঘ্য ও ব্যাস ছিল যথাক্রমে ৩০ ও ১১ ইঞ্চি। ১০-২০ টন টিএনটির সমতুল্য বিস্ফোরণের ক্ষমতা ছিল তার।
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পরমাণু বোমা বানানোর পর যুদ্ধের ময়দানে এটি ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে শুরু হয় চিন্তাভাবনা। এর জন্য ‘ডেভি ক্রোকেট’ নামের বিশেষ ধরনের একটি রাইফেল ব্যবহার করত মার্কিন ফৌজ, যার সাহায্যে ‘বাজ়ুকা’ প্রযুক্তিতে আণবিক হামলা চালাতে পারত বাহিনী। পরবর্তী কালে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারের একটি উন্নত সংস্করণ তৈরি করে ওয়াশিংটন, নাম ‘ডব্লিউ৩৪’।
১৯৮০-র দশকে ‘স্পেশাল অ্যাটোমিক ডেমোলিশন মিউনিশন’ বা এসএডিএ নামের প্রকল্পের আওতায় ছোট অথচ উন্নত ধরনের পরমাণু বোমা তৈরির দিকে নজর দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর জন্য জলের মতো খরচ করতেও দ্বিধা করেনি ওয়াশিংটন। ফলে, কয়েক বছরের মধ্যেই ‘ডব্লিউ৩৪’কে হাতে পায় আমেরিকা। এতে সুটকেসে ভরে আণবিক হামলার সক্ষমতা পায় আটলান্টিকের পারের ‘সুপার পাওয়ার’।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, ‘ডব্লিউ৫৪’-এর মতো ‘ডব্লিউ৩৪’ও একটি কৌশলগত পরমাণু বোমা। প্লুটোনিয়ামের সাহায্যে একে তৈরি করে মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষক বাহিনী। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারে হামলা চালাতে কমপক্ষে দু’জন সৈনিকের প্রয়োজন। কোনও অ্যাটাচি কেসে আণবিক অস্ত্রটিকে ভরে লক্ষ্যের খুব কাছে গিয়ে রেখে আসবেন তাঁরা। তা হলেই টাইম বম্বের মতো নির্ধারিত সময়ে ফাটবে সেটি।
আরও পড়ুন:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ অগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক হামলা চালায় আমেরিকা। চোখের নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় দ্বীপরাষ্ট্রের ওই দুই শহর। হিরোশিমায় ফেলা পরমাণু বোমাটির সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘লিটল বয়’। অন্য দিকে, নাগাসাকিতে পড়া বোমাটির সাঙ্কেতিক নাম ‘ফ্যাট ম্যান’ রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পরমাণু হামলায় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে মৃত্যু হয় প্রায় আড়াই লাখ মানুষের। এ ছাড়া জাপানের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। ফলে, পরবর্তী কালে ক্যানসার-সহ নানাবিধ দুরারোগ্য ব্যাধিতে প্রাণ হারান আরও অনেকে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ‘ডব্লিউ৩৪’-এর ধ্বংসক্ষমতা সীমিত। এর সাহায্য কোনও শহর উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, ‘ডব্লিউ৩৪’-এর সাহায্যে গুরুত্বপূর্ণ বহুতল, সরকারি ভবন, সেতু বা বাঁধের মতো কৌশলগত পরিকাঠামোতে হামলা চালানো সম্ভব। চোখের নিমেষে সেগুলিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে এই কৌশলগত আণবিক হাতিয়ার। এর থেকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে, একই কায়দায় আণবিক জ্যাকেট তৈরির ব্যাপারে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কথায়, পরমাণু বোমা আর পাঁচটা সাধারণ বিস্ফোরকের মতো নয়। গণবিধ্বংসী এই হাতিয়ারের নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং হামলার পদ্ধতি বেশ জটিল। আর তাই ‘ফিদায়েঁ’ হামলার কায়দায় আণবিক আক্রমণ শানানো কার্যত অসম্ভব। তা ছাড়া, শরীরে পরমাণু বিস্ফোরক বেঁধে রাখলে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জেরে লক্ষ্যে পৌঁছোনোর আগেই মৃত্যু হতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির।
ভান্সের বক্তব্য, ‘ফিদায়েঁ’ হামলার মতো করে পরমাণু বোমা তৈরি করছে ইরান। বিশ্লেষকদের বক্তব্য, আপাতত সেই কাজ করা তেহরানের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, প্লুটোনিয়ামের সাহায্যেই একমাত্র তৈরি করা যায় ছোট আকারের আণবিক বোমা। অন্য দিকে, ইউরেনিয়ানের সাহায্যে এই গণবিধ্বংসী হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন সাবেক পারস্যের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা।
দ্বিতীয়ত, ছোট আকারের পরমাণু বোমা লক্ষ্যের কাছে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ, তেজস্ক্রিয় বিকিরণে খুব সহজে চিহ্নিত হতে পারে সেটি। ফলে, ভান্সের দাবি সত্যি হলেও ইরান যে কোনও আণবিক ‘ফিদায়েঁ’ হামলা চালাতে পারবে, সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নজরদারি এড়িয়ে জনবহুল এলাকায় তেহরান পরমাণু আক্রমণ শানাবে, এই ধারণা কষ্টকল্পিত।
পরমাণু বোমা তৈরি করতে প্রয়োজন বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তেজস্ক্রিয় ধাতুটির ৬০ শতাংশের বেশি ‘শুদ্ধিকরণ’ বা এনরিচমেন্ট করতে সক্ষম হয়েছে ইরান। আণবিক হাতিয়ার তৈরি করতে হলে একে ৯০ শতাংশ বা তার বেশিতে নিয়ে যেতে হবে। তবে, ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে অনায়াসে ‘নোংরা’ বোমা (পড়ুন, ডার্টি বম্ব) বানাতে পারবে তেহরান।
পরমাণু অস্ত্রের মতো ‘নোংরা’ বোমা কোনও বিস্ফোরণ ঘটায় না। এর সাহায্যেও ছড়ানো যায় তেজস্ত্রিয়তা। আর তাই ডার্টি বোমার হামলায় খুব দ্রুত ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে আস্ত একটা শহর। তবে, ইরান এই ধরনের কোনও প্রকল্পে কাজ করছে বলে এখনও কোনও খবর পাওয়া যায়নি। এর জেরে ভান্সের আশঙ্কাকে অমূলক বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।