প্রথমে গোড়ালি, তার পরে পায়ের আঙুল— এ ভাবে পা ফেলে প্রতি দিন গড়ে হাজার পদক্ষেপ করে সাধারণ মানুষ। খেয়াল না করলেও হাঁটার প্রক্রিয়া এটাই। আর এই অভ্যাস একেবারেই মানুষের নিজস্ব। তা করেই মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর আগে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা পৃথিবীতে। যদিও ওই ভাবে হাঁটার কারণে তাকে শারীরিক ভাবে একটু বেশি কষ্টও সইতে হয়েছিল। হাড়ে, গাঁটে অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল। তার জন্য আবার তার বিবর্তনও হয়েছিল। এমনটাই বলছে সাম্প্রতিক এক গবেষণা।
পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক এই হাঁটার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ সেই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই হাঁটার পদ্ধতির কারণেই মানুষ বানর বা শিম্পাঞ্জির থেকে আলাদা।
গোড়ালি আগে ফেলে হাঁটার কৌশল মানুষের সঙ্গেই রয়েছে শিম্পাঞ্জির। মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি কী ভাবে হাঁটে তা বোঝার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন বিজ্ঞানীরা। আঘাতজনিত বল পরিমাপের জন্যও একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। তাতে দেখেন, শিম্পাঞ্জি এবং মানুষের হাঁটার ধরনে সামান্য ফারাক রয়েছে। দেখা গিয়েছে, দু’পায়ে হাঁটতে গিয়ে বেশির ভাগ সময় শিম্পাঞ্জিরা পায়ের পাশ আগে মাটিতে ফেলে। গোড়ালি আগে ফেলে হাঁটার প্রবণতা তাঁদের মধ্যে কম। মানুষ সব সময়েই আগে গোড়ালি ফেলে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সে কারণেই শিম্পাঞ্জির থেকে আধুনিক মানুষ অনেক বেশি দূরত্ব হেঁটে যেতে পারে।
গোড়ালি আগে ফেলার কারণে মানুষের হাঁটতে সুবিধা হয়। এই পদ্ধতি তাকে পিছন দিক থেকে সহজ ভাবে সামনের দিকে ঠেলে দেয়। তাই মানুষ সহজেই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। তবে এ ভাবে পা ফেলার কারণে তার পায়ে চাপও পড়ে বেশি। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি কলেজ অফ অস্টিওপ্যাথিক মেডিসিনের অধ্যাপক নাথান থম্পসন বলেন, ‘‘ধরুন আপনি একটি মড়মড়ে কাঠের মেঝের উপর দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তখন আপনি সাধারণত পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করেন। কারণ ওই অংশ মেঝের উপর পড়ার বলের গতিকে কমিয়ে দেয় এবং শব্দ কম তৈরি করে।’’
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গোড়ালি আগে ফেলে হাঁটার জন্য মানুষের কিছু অভিযোজনও হয়েছে। গবেষক হলোকার মতে, সেই অভিযোজন হয়েই আধুনিক মানুষের গোড়ালির হাড় আরও মোটা হয়েছে। হাঁটু আকারে বড় হয়েছে। শিকার ধরার জন্য মানুষকে অনেক দূর হাঁটতে হত। গোড়ালি আগে মাটিতে রেখে পা ফেলে তারা সহজে সে কাজ করতে পারত। তার ফলে অনেক বেশি শিকার পেত মানুষ।
আরও পড়ুন:
স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রায় ৩৬ ফুট দীর্ঘ একটি পথ তৈরি করেন। তাতে তিনটি পুরুষ শিম্পাঞ্জি কী ভাবে চার পায়ে, দু’পায়ে হাঁটে, তা দেখেন। ওই একই পথে ১২ জন মানুষ কী ভাবে হাঁটছেন, তা-ও রেকর্ড করে রাখেন গবেষকেরা। ওই ১২ জনকে শিম্পাঞ্জিদের হাঁটার ধরন অনুকরণ করতেও বলা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেন, হাঁটার জন্য মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি কত শক্তি খরচ করছে। তাঁরা এ-ও দেখেন, দু’পায়ে হাঁটার সময় শিম্পাঞ্জিরা গোড়ালি আগে ফেলেছে, এ রকম কমই হয়েছে। থম্পসনের মতে, দুই পায়ে হাঁটার সময় শিম্পাঞ্জিরা তাদের পায়ের পাতা মাটিতে ফেলার জন্য তুলনামূলক নরম বা মৃদু পদ্ধতিটি বেশি পছন্দ করে। তবে মানুষ প্রতি বারই গোড়ালি আগে ফেলেছে (হিল স্ট্রাইক), যা অনেক বেশি বল তৈরি করে। পায়ের আঙুল আগে ফেললে যত বল তৈরি হয়, তার চেয়ে মানুষ গোড়ালি আগে ফেললে ১৬২ শতাংশ বেশি। হলোকার মতে, সেই শক্তি খরচ হয় বলেই মানুষের গোড়ালি, হাঁটুর বিবর্তন হয়েছে। বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, সে কারণে মানুষ আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে গোটা পৃথিবীতে। মানুষের সব প্রজাতির জন্মই আজকের আফ্রিকায়। সেই জায়গায় আটকে থাকেনি তারা। ক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবীতে। নেপথ্যে তাদের হাঁটার পদ্ধতি।