Advertisement
E-Paper

নদীগর্ভের বরফ কি আঠার মতো আটকে রাখতে পারে আশপাশের মাটি? ভাঙন নিয়ে এত দিনের ধারণা ভাঙল নতুন গবেষণায়

গত কয়েক দশকের মধ্যে সুমেরু অঞ্চলে নতুন নদীখাত তৈরি হতে দেখা গিয়েছে। যেমনটা ভাবা হত, তার চেয়েও দ্রুত তৈরি হচ্ছে নতুন নদীখাত। কী কারণে এটি হচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণায় উঠে এল নতুন তথ্য।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:০০

— প্রতীকী চিত্র।

যে নদীগর্ভে বরফ থাকে, সেখানে নদীর পাড়ে ক্ষয় তুলনামূলক ধীরে হয়— বিজ্ঞানীমহলে এটাই প্রচলিত ধারণা ছিল এত দিন। এ বার সেই ধারণা ভেঙে গেল নতুন গবেষণায়। দেখা গেল, নদীগর্ভে বরফ থাকলে সেখানে পাড় ভাঙার সম্ভাবনা অন্য নদীর তুলনায় বেশি। তা-ও প্রায় ১০ গুণ।

মূলত কানাডার সুমেরু অঞ্চলের নদীগুলির উপরে এই গবেষণাটি চলে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বের অন্য প্রান্তের চেয়ে সুমেরু অঞ্চল প্রায় চার গুণ দ্রুততায় উষ্ণ হচ্ছে। একই সঙ্গে বদলাচ্ছে সুমেরু অঞ্চলের ভূমিরূপ। বদলে যাচ্ছে নদীখাত। গত কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে নতুন নদীখাত তৈরি হতে দেখা গিয়েছে। যেমনটা ভাবা হত, তার চেয়েও দ্রুত নতুন নদীখাত তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সুমেরু অঞ্চলে এমনটা হওয়া বেশ ‘অস্বাভাবিক’ বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞানীদের মতে, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে যে ভূমিরূপ, তাতে সারা বছর ধরে নদীতে ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সুমেরু অঞ্চল তেমনটা নয়। তাই সুমেরু অঞ্চল এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের নদীগর্ভের ফারাক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন গবেষকেরা। কানাডার সাইমন ফ্রেজ়ার বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা যৌথ ভাবে এই গবেষণাটি চালান। সম্প্রতি তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘কমিউনিকেশন্‌স আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে।

গবেষকেরা এত দিন মনে করতেন, জলের তলার হিমায়িত মাটি নদীর ভাঙনকে মন্থর করে দেয়। কারণ, নদীগর্ভে জমে থাকা এই বরফ আঠার মতো কাজ করে। চারপাশের মাটিকে সঠিক জায়গায় আটকে রাখে। কিন্তু নতুন গবেষণার পরে বিজ্ঞানীদের দাবি, এত দিন তাঁরা যা মনে করতেন, তা সম্পূর্ণ ভুল।

গবেষণাটি শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালে। গবেষণার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উষ্ণায়নের ফলে সুমেরু অঞ্চলে ভূমিরূপে কী পরিবর্তন আসছে, তা খতিয়ে দেখা। বরফ জমা বা গলে যাওয়ার সময়ে তার কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়েই এই গবেষণা শুরু হয়। সেই সূত্র ধরে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের তুলনায় সুমেরু অঞ্চলের হিমায়িত নদীখাতের ক্ষয়ের হার নিয়ে কী রকম, তা পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।

ওই পর্যবেক্ষণের সময়েই গবেষকেরা আভাস পান, সুমেরু অঞ্চলে বেশ কিছু নতুন নদীখাত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তা-ও আশ্চর্যজনক দ্রুত গতিতে সেগুলি তৈরি হতে পারে। যা থেকে তাঁদের অনুমান, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের চেয়ে সুমেরু অঞ্চলে তুলনামূলক দ্রুত নদীভাঙন হতে পারে।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য উঠে আসায় বেশ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য তথা সাইমন ফ্রেজ়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী জোনাস এসচেনফেল্ডারের কথায়, “আমারা যেমনটা আশা করেছিলাম, তার ঠিক উল্টোটাই উঠে এসেছে গবেষণায়।” তাই ওই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গবেষণাগারে তা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা ‘ল্যাব স্ট্রিম’ প্রক্রিয়ায় নদীগর্ভের একটি অনুকরণ তৈরি করেন পরীক্ষাগারে। তাঁরা ৪৭ ইঞ্চি লম্বা দু’টি কাঁচের টুকরো দিয়ে নদীখাত বানান। নুড়িপাথরের বদলে ব্যবহার করেন কাঁচের পুঁতি।

গবেষণাগারে বিভিন্ন তাপমাত্রায় এটি পরীক্ষা করা হয়। সুমেরু অঞ্চল এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের জলবায়ু নদীগুলির উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়। এই নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় তাঁদের অনুমান আরও স্পষ্ট হয়। কোথাও যাতে কোনও ত্রুটি না থাকে, সে জন্য বার বার পরীক্ষাটি করেন তাঁরা। তা-ও প্রতিবারই একই ফল আসে। দেখা যায়, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের তুলনায় সুমেরু অঞ্চলের নদীগুলিতে ক্ষয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

এটি আরও বিশদে পরীক্ষা করার জন্য একটি গাণিতিক মডেলও তৈরি করেন এসচেনফেল্ডার এবং তাঁর সঙ্গীরা। তাঁরা ওই গাণিতিক মডেল পরীক্ষা করার জন্য সুমেরু অঞ্চলের ডেভন দ্বীপেও যান। গবেষকদের অনুমান, নদীগর্ভের মাটি যখন পুরোপুরি জমে বরফ হয়ে থাকে, তখন প্রত্যাশিত ভাবেই ক্ষয় কমে যায়। তখন সেখানে কোনও কিছুকেই নড়ানো যায় না। কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের ফলে এক সময়ে নদীগর্ভের ওই বরফ গলতে শুরু করে। তখন অগভীর একটি স্তর গলে যায়। তবে তার নীচেও হিমায়িত মাটি (পারমাফ্রস্ট, অর্থাৎ যে মাটি টানা দু’বছর বা তার বেশি সময় ধরে হিমাঙ্কের নীচে থেকে বরফ হয়ে যায়)-র স্তর থেকে যায়। নদীর জল ওই হিমায়িত মাটিকে সরিয়ে যেতে পারে না। ফলে নদীর জল আশপাশে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গবেষকদের দাবি, সুমেরু অঞ্চলের নদীগুলিতে ভাঙনের কারণ এটিই।

Arctic River Erosion

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy