Advertisement
E-Paper

রানি-রহস্যের উন্মোচন! হারিয়ে যাওয়া প্রত্ননিদর্শনের আবছা হয়ে যাওয়া ছবিই স্বীকৃতি দিল মিশরের সেই ‘নারী রাজা’কে

মেরিটনিথ নিছক এক ‘রানি’ ছিলেন না। একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই পুরুষ শাসকদের সমকক্ষ ‘নারী রাজা’ বা ‘ফিমেল কিং’। দাবি নতুন গবেষণায়।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪৬
New study shows queen Meretneith might have ruled Egypt five thousand years ago

অন্তত তিরিশ বছর ধরে মিশরের রাশ কোনও না কোনও ভাবে এই নারীর হাতে ছিল। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

নীল নদের তীরে অনন্ত বালুকণা আর হাওয়ার রাজত্বের মাঝে একের পর এক রাজবংশের উত্থান-পতন হয়েছে। রেখে গিয়েছে এমন সব কাহিনি, যা আজকের অ্যাকশন ছবির চিত্রনাট্যকেও হার মানাতে পারে। সেই দীর্ঘ ইতিহাসে যুগে যুগে রাজদণ্ড হাতে তুলে নিয়েছেন বেশ কয়েক জন নারীও। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম হাটশেপসুত, নেফারতিতি, ক্লিওপেট্রারা। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে শুধু ক্লিওপেট্রা নামধারী সাত রানির খোঁজ মেলে মিশরে।

এখনও পর্যন্ত সোবেকনেফেরুই ছিলেন মিশরের প্রথম নারী শাসক, যাঁর শাসনকাল সম্পর্কে লিখিত নথি পাওয়া গিয়েছে। চার হাজার বছর আগে তিন বছর দশ মাস চব্বিশ দিনের রাজত্বকাল তাঁর। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমাণ ধরলে তারও হাজারখানেক বছর আগে মিশর শাসন করেছিলেন নিথহোটেপ নামের এক নারী। তিনি মিশরের প্রথম রাজবংশের ছিলেন। তাঁকেই মিশরের প্রথম ‘ফিমেল কিং’ ধরা হয়। নিথহোটেপ এবং সোবেকনেফেরু— এই দুই নারী শাসকের মাঝে আর এক রানির কথা জানা ছিল, যাঁকে নিয়ে একইসঙ্গে ছিল রহস্য এবং বিতর্ক। সেই বিতর্কে সম্ভবত যবনিকা পড়তে চলেছে।

নাম তাঁর মেরিটনিথ বা মেরনিথ। নামের অর্থ— ‘নিথের প্রিয়’। প্রাচীন মিশর বা লিবিয়ায় ‘নিথ’ ছিলেন যুদ্ধ ও মাতৃত্বের দেবী। মেরিটনিথ রাজপরিবারের নারী এ নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, তিনি কি প্রকৃত অর্থে শাসক ছিলেন? অনেকটাই জট খুলে গেল সম্প্রতি, চেক প্রজাতন্ত্রের চার্লস ইউনিভার্সিটির ইজিপ্টোলজিস্ট স্যু কেলি এবং রোমানিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ বুখারেস্টের ডিজিটাল আর্কিয়োলজিস্ট ক্রিস্টাল মিলারের গবেষণায়। ‘প্রাগ ইজিপ্টোলজিক্যাল স্টাডিজ়’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের গবেষণাপত্র। কী ভাবে নতুন ভাবে আবিষ্কৃত হলেন মেরিটনিথ, তাঁর রাজনৈতিক মর্যাদা এবং দীর্ঘ তিন দশক ধরে বিভিন্ন ভূমিকায় তাঁর শাসনের নতুন ছবি তুলে ধরা হয়েছে সেখানে।

কেলি এবং মিলার তাঁদের গবেষণায় বিশেষ একটি ‘ডিজিটাল ইমেজিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এর সাহায্যে প্রাচীন হায়ারোগ্লিফগুলিকে আলাদা করে নেওয়া হয়। পাল্টানো হয় রং। তার পর ছবিগুলিকে হাই-কনট্রাস্ট ভেক্টর গ্রাফিকে রূপান্তরিত করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই, যে চিহ্নগুলি খালি চোখে অস্পষ্ট, সেগুলিকে আবার পাঠযোগ্য করে তোলা। আর তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি নাম— মেরিটনিথ। তাঁর নামের দেখা মিলল ‘সেরেখ’-এ, যা মিশরে প্রথম রাজবংশের রাজত্বকালে রাজার নাম-সহ একটি আয়তাকার প্রতীক। অর্থাৎ, রাজকীয় সিলমোহর। এর চূড়ায় বসে থাকেন বাজপাখিরূপী দেবতা হোরাস, যিনি রাজক্ষমতার প্রতীক। এই ধরনের সেরেখ জুড়ে পুরুষদেরই আধিপত্য। দেবতা হোরাসের প্রতীকের সঙ্গে সেরেফে এত দিন একজন নারীর নামই পাওয়া গিয়েছিল। তিনি নিথহোটেপ। এ বার সেখানে আবিষ্কৃত হলেন মেরিনটিথ।

কাদামাটি দিয়ে তৈরি ১৩টি ছিপির গায়ে এই সেরেখগুলি পাওয়া যায়। এই ছিপিগুলি মাটির বা অন্যান্য পাত্রের মুখ বন্ধ করে রাখার জন্য ব্যবহৃত হত। প্রায় ৮০ বছর আগে সাক্কারার একটি সমাধিক্ষেত্রে এই ছিপিগুলি উদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু সেই ছিপিগুলি এবং সেগুলোর আসল ‘ফটোগ্রাফিক নেগেটিভ’ কোনও ভাবে হারিয়ে গিয়েছিল। গবেষক কেলি এবং মিলার মূলত ‘ইজিপ্ট এক্সপ্লোরেশন সোসাইটি’-র আর্কাইভে থাকা ৭২ বছরের পুরনো একটি অস্পষ্ট, সাদা-কালো ছবির উপর ভিত্তি করে ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে এর পাঠোদ্ধার করেছেন। রাজকীয় সমাধি এবং মমি অধ্যুষিত সাক্কারা, যেখানে মেরিটনিথের নামোল্লেখ করা সেরেফ-সহ ছিপিগুলি উদ্ধার হয়েছিল, সেখানে কিন্তু তাঁর সমাধি পাওয়া যায়নি। পাওয়া গিয়েছে অন্যত্র। কিন্তু তাঁর নাম সেখানে রাজকীয় প্রতীক-সহ উল্লিখিত। স্যু কেলির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই প্রমাণ মেরিটনিথকে তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজাদের সমকক্ষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ, প্রথম রাজবংশের আমলে (আনুমানিক ৩০০০-২৮৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মেরিটনিথ নিছক কোনও ‘রানি’ ছিলেন না। একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই এক পুরুষ শাসকের সমকক্ষ ‘নারী রাজা’ বা ‘ফিমেল কিং’।

তাঁর রাজকীয় ‘প্রতাপ’ বুঝতে হলে পা রাখতে হবে আবিদোসের মাটিতে। সেখানে তাঁর সুবিশাল সমাধিটি আর পাঁচজন সাধারণ রানির মতো নয় একেবারেই। বরং এক জন অবিসংবাদিত শাসকের শেষ শয্যার চিহ্ন তাতে স্পষ্ট। সমাধির চারপাশে থরে থরে সাজানো বিশাল আকারের সব মদের পাত্র। তাঁর সমাধি ঘিরে রয়েছে আরও ৫০টির মতো ছোটছোট সমাধি ও প্রকোষ্ঠ। মৃত্যুর পর ‘পরপারে সেবার জন্য’ অনুচর ও পরিচারকদের সমাহিত করা হয়েছিল সেখানে। শুধু তা-ই নয়, শাসকের চরম ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে একটি সুবিশাল পাথরের ‘স্টেলা’-তেও পরম যত্নে খোদাই করা রয়েছে তাঁর নাম। সমাধি থেকে এই ধরনের দু’টি ফলক উদ্ধার হলেও, দ্বিতীয়টি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে তার লিপি পড়া যায়নি। স্টেলা হল সোজা দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের স্তম্ভ বা ফলক। এর গায়ে লিপি বা চিত্র খোদাই করা থাকে। সাধারণত কোনও বিশেষ ব্যক্তি বা ঘটনা স্মরণ করতে, সীমানা চিহ্নিত করতে, অথবা মৃত ব্যক্তি বা দেবদেবীর সঙ্গে ‘যোগাযোগের মাধ্যম’ হিসেবে স্টেলাগুলি ব্যবহার করা হত। শুধু মিশরেই নয়, এই ধরনের স্টেলা মায়া, অ্যাসিরীয়, গ্রিক এবং রোমান সভ্যতাতেও মিলেছে।

অন্তত তিরিশ বছর ধরে মিশরের রাজনীতির রাশ কোনও না কোনও ভাবে নিজের হাতে রেখেছিলেন এই নারী। গবেষকদের ধারণা, তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছিলেন পিতা তথা মিশরের তৃতীয় রাজা জের-এর হাত ধরে। কেন এমনটা মনে করা হচ্ছে? কারণ যে কাদার ছিপিগুলিতে মেরিটনিথের নাম-যুক্ত সেরেখ পাওয়া গিয়েছে, সেখানে রাজা জেরের নামও দেখা যায়। উল্লেখ্য, প্রথম রাজবংশের আমলে শাসককে ‘ফ্যারাও’ বলা হত না। বলা হত ‘নেসুট’। ‘ফ্যারাও’-এর সূত্রপাত আরও দেড় হাজার বছর পর নব্য রাজবংশের আমলে।

গবেষকদের অনুমান, শুরুতে হয়তো তিনি ছিলেন ‘ক্রাউন প্রিন্সেস’ বা সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। তার পর পিতা জের-এর সঙ্গে সহ-শাসক হিসেবে রাজত্ব করেন। এর পর সময় গড়িয়েছে। রাজা জেরের মৃত্যুর পর ১০ বছর শাসনভার সামলেছেন মেরিটনিথের ভাই তথা স্বামী জেট। রাজা জেটের মৃত্যুর পর তাঁদের পুত্র ডেন যখন নাবালক, তখন সেই ছেলেকে বুকে আগলে রাজপ্রতিনিধি হিসেবে মিশরের রাজদণ্ড একার হাতে তুলে নিয়েছিলেন মেরিটনিথ। কোনও সুনির্দিষ্ট রাজকীয় উপাধি ছাড়াই তিনি গোটা সাম্রাজ্য শাসন করতেন (আনুমানিক ২৯৯০-২৯৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। গবেষকদের মতে, রাজকোষ থেকে শুরু করে রাজকর্মচারী—সাম্রাজ্যের প্রতিটি বিষয়ের উপর ছিল তাঁর নিরঙ্কুশ আধিপত্য।

মৃত্যুর পরেও তিনি কতটা সম্মানিত ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে ছেলে ডেন-এর সমাধিতে পাওয়া একটি রহস্যময় সিলমোহরে। সেখানে পূর্বসূরি শাসকদের একটি কালানুক্রমিক তালিকা বা মৃত্যু-পরবর্তী উপাসনার বিবরণের শেষে লেখা রয়েছে মেরিটনিথের নাম, আর তাঁর উপাধি—‘রাজমাতা’ (কিং’স মাদার)। এমনকি মেরিটনিথের রাজনৈতিক গুরুত্ব তাঁর মৃত্যুর পরেও মাথায় রেখেছিল পরবর্তী প্রজন্ম। পরবর্তী শাসক সেমেরখেতের সমাধির সিলমোহরেও সযত্নে খোদাই করা হয়েছিল তাঁর নাম। স্যু কেলি মনে করেন, এটি মেরিটনিথের শাসন ও রাজনৈতিক মর্যাদারই স্বীকৃতি।

তবে মেরিটনিথের এই স্বীকৃতি পাওয়ার ‘লড়াই’ এখনও শেষ হয়নি। কারণ তাঁকে ঘিরে বিতর্ক বহু কালের। আর বিতর্কে জুড়ে রয়েছেন বহু ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক, গবেষক। তাই নতুন গবেষণার ফল নিয়েও কাটাছেঁড়া চলবেই।

Egypt

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy