লেজের শেষ প্রান্তটা দেখতে মাকড়সার মতো। ডগার অংশটি গোলাকার হয়ে ফুলে ওঠা। সেখান থেকে চার দিকে কাঁটার মতো ছ়ড়িয়ে রয়েছে লেজের অংশ। লেজের ডগা নড়লে এক ঝলক দেখে মাকড়সা ভেবে ভুল হতেই পারে। কিন্তু এটি আসলে বিষধর স্পাইডার টেলড হর্ন ভাইপারের লেজ। ভাইপার গোষ্ঠীর এক বিরল প্রজাতির সাপ। এদের মতো ‘মাকড়সা-লেজের’ বৈশিষ্ট্য অন্য ভাইপারদের মধ্যে নেই। তা হলে শুধু এদের লেজই কেন এমন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যা উঠে এল, তাতে বিস্মিত গবেষকেরা।
মূলত পশ্চিম ইরান এবং তার আশপাশের পাহাড়ি ও মরু এলাকায় এই সাপেদের দেখা যায়। প্রথম সন্ধান মিলেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তখন তাদের লেজের এই ‘অস্বাভাবিক’ গড়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অনেকেই মনে করেছিলেন, হয়ত সাপটির লেজে কোনও ‘টিউমার’ হয়েছে। বা কোনও পরজীবী বাসা বেঁধেছে। সেই ভুল ভাঙে প্রায় সাড়ে তিন দশক পরে। ২০০৩ সালে স্পাইডার টেলড হর্ন ভাইপারের আরও একটি নমুনা পাওয়া যায়। সেটিরও লেজে ছিল ‘মাকড়সা’। শেষে ২০০৬ সালে এটিকে নতুন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি এতটাই বিরল যে সন্ধান পাওয়ার পর প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হতে হতে ২৮ বছর লেগে গিয়েছে।
সম্প্রতি এই প্রজাতিটির লেজের গড়ন নিয়ে গবেষণা করেন শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামের নেগাউনি ইন্টিগ্রেটিভ রিসার্চ সেন্টারের সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ সারা রুয়ান। গত সপ্তাহে ‘দ্য অ্যানাটমিক্যাল রেকর্ড’ জার্নালে তাঁর গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। সাপটির লেজের গড়ন কেন এমন, তা বোঝার জন্য রুয়ান এবং তাঁর সহযোগীরা সাপটির লেজের ডগার কশেরুকার গড়ন বিশ্লেষণ করার সিদ্ধান্ত নেন। উন্নত মানের এক্স-রে পদ্ধতি ব্যবহার করেন তাঁরা। লেজের ডগা স্ক্যান করে দেখা যায়, বাইরের চেহারায় যেমন ‘অস্বাভাবিকতা’ রয়েছে, কশেরুকায় তেমন কিছুই নেই। অধিকাংশ ভাইপারের মতোই স্বাভাবিক এবং সাধারণ গড়ন কশেরুকাগুলির।
তা হলে লেজে এই ‘মাকরসা’ এল কোথা থেকে? গবেষণায় দেখা যায়, লেজের ওই অংশে কোনও হাড়গোড় নেই। তার বদলে রয়েছে লম্বাটে কিছু আঁশ। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য ‘পোলিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অফ সিস্টেম্যাটিক্স অ্যান্ড ইভোলিউশন অফ অ্যানিম্যালস’-এর অধ্যাপক জর্জিওস জর্জিয়ালিস বলেন, “আমরা দেখতে চাইছিলাম স্পাইডার টেলড হর্ন ভাইপারের লেজের ভেতরটাও একই রকম অদ্ভুত কি না।” কিন্তু, তাঁদের গবেষণায় যা উঠে আসে, সেটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল রুয়ান, জর্জিয়ালিসদের কাছে। একই সঙ্গে তাঁদের এ-ও বুঝিয়ে দেয় যে, কোনও প্রাণীর কঙ্কাল বা জীবাশ্ম কখনোই সেই প্রাণীর সম্পূর্ণ চেহারা সবসময় তুলে ধরে না।
আরও পড়ুন:
“আজ যদি সাপের দেহের বদলে শুধু জীবাশ্ম পাওয়া যেত, তা হলে এর মাকড়সার মতো লেজের গড়ন আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না,” বলেন জর্জিয়ালিস। তাঁর সংযোজন, “এর থেকে আবার স্পষ্ট হয় যে কোনও জীবাশ্ম বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোনও প্রাণীর প্রকৃত চেহারা না-ও তুলে ধরতে পারে।”
স্পাইডার টেলড হর্ন ভাইপার তাদের এই লেজ মূলত শিকার ধরার জন্য ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করে। লেজের ওই মাকড়সার মতো অংশটি দেখে তা ধরার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারি পাখিরা। আর তখনই সে ভাইপারের শিকার হয়ে যায়। কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিদ্যার অধ্যাপক কার্ট শোয়েঙ্কের মতে, সম্ভবত লেজ নাড়ানোর মতো বৈশিষ্ট্যটি এদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ছিল। পরবর্তী সময়ে বিবর্তনের ধারায় তা আরও উন্নত হয়েছে। তাঁর কথায়, “স্পাইডার টেলড হর্ন ভাইপার সম্ভবত পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই এই আচরণটি পেয়েছে। পরে সিটে আরও উন্নত কিছুতে রূপান্তরিত হয়েছে।”