আজ থেকে প্রায় ১৫ কোটি বছর আগের কথা। তখন জুরাসিক যুগের শেষ ভাগ। ওই সময়েই আবির্ভাব হয়েছিল আর্কিওপটেরিক্সদের— পৃথিবীর আদিম পাখিদের। তবে তারা উড়তে শিখল কী ভাবে? বছরের পর বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তা নিয়ে নতুন তত্ত্ব উঠে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, শুধু ডানার জোরে ওড়ার ক্ষমতা ছিল না আর্কিওপটেরিক্সদের। ওড়ার জন্য পর্যাপ্ত গতি পেতে এদের দুই-তিন বার লাফ দিতে হত।
আর্কিওপটেরিক্সদের পুরোপুরি পাখি বলা যায় না। এদের ডানা ছিল। উড়তেও পারত। জুরাসিক যুগের শেষ পর্বের এই প্রাণীরা ছিল ডাইনোসর (সরীসৃপ) এবং পাখিদের মধ্যবর্তী পর্যায়ের এক প্রাণী। এদের মধ্যে দু’ধরনের বৈশিষ্ট্যই দেখা যায়। এদের গোটা শরীর ছিল পালকে ঢাকা। পাখিদের মতো হালকা ফাঁপা হাড় ছিল। আবার ডাইনোসরদের মতো এদের চোয়ালেও ধারালো দাঁত ছিল। লেজে লম্বা হাড় ছিল। ডানার প্রতিটি আঙুলে থাকত নখ।
আধুনিক পাখিদের মতো উন্নত শারীরিক গঠন ছিল না আর্কিওপটেরিক্সদের। এদের শরীরে কিল (বুকের হাড় বা স্টার্নামের একটি বর্ধিত অংশ, যা পাখির ডানার পেশিগুলির সঙ্গে যুক্ত থাকে। ওড়ার সময়ে ডানা নাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায় এবং ভারসাম্য বজায় রাখে) ছিল না। ফলে এদের কাঁধের নড়াচড়া ছিল সীমিত। তাই এরা কী ভাবে উড়তে শিখল, তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই কৌতূহল ছিল বিজ্ঞানীমহলে। এবং তা এত দিন রহস্যই রয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি ব্রিটেনের সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এ নিয়ে পরীক্ষানিরিক্ষা করেন। ‘ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজি’ জার্নালে সম্প্রতি সেই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদলের প্রধান তথা সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন জীববিদ্যা বিশেষজ্ঞ নিল গোস্টলিঙের কথায়, “আর্কিওপেটেরিক্সই হল প্রথম সত্যিকারের পাখি। কিন্তু এদের মধ্যে ডাইনোসরদের বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও ছিল।”
আধুনিক পাখিরা ডানা ঝাপটানোর সময়ে দুই পা দিয়ে নীচের দিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। তাতেই তারা উড়ে যেতে পারে আকাশে। কিন্তু আর্কিওপটেরিক্স শুধু ডানার উপর নির্ভর করে উড়তে পারত না। কারণ তাদের কিলযুক্ত স্টার্নাম ছিল না। এদের কাঁধ ডানাকে পিঠের উপরে তুলতে পারত না। ফলে আদিম পাখিদের ওড়ার জন্য অনেক বেশি নির্ভর করতে হত তাদের পায়ের উপর। ওড়ার জন্য যে প্রাথমিক গতি দরকার, তার জোগান দিত দুই পা-ই। তার পরে বাকি কাজ করে নিত ডানা।
আরও পড়ুন:
আর্কিওপটেরিক্সদের বাকি শরীরের তুলনায় পায়ের ভর বর্তমান পাখিদের চেয়ে ছিল বেশি। আধুনিক পাখিদের ক্ষেত্রে শরীরের ভরের ৯-১০ শতাংশ থাকে পায়ের ভর। আদিম পাখিদের ক্ষেত্রে তা ছিল দেহের ভরের প্রায় ১৩ শতাংশ।
এখনও পর্যন্ত আর্কিওপটেরিক্সের যত নমুনা পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে অনুমান করা হয় এদের ওজন হত ২০০-৬০০ গ্রামের মধ্যে। সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞেরা ৪০০ গ্রামের একটি কম্পিউটার মডেল (বায়োমেকানিক্যাল মডেল) ব্যবহার করেন। তার ভিত্তিতে আদিম পাখিদের পায়ের অস্থিসন্ধির এবং গোড়ালির মোচড় পরীক্ষা করা হয়। একটি লাফে, বার বার লাফে এবং ডানার ঝাপটার সঙ্গে লাফ দেওয়ার সময়ে কী ঘটে, তা পরীক্ষা করে দেখেন গবেষকেরা।
আদিম ওই পাখিদের ওড়ার জন্য সেকেন্ডে সাত মিটার গতির দরকার ছিল। কিন্তু প্রথম একটি লাফে ওই কম্পিউটার মডেলটি সেকেন্ডে ২.৯৮ মিটার গতি পায়। আবার পর পর তিনটি লাফ দিলে তারা ৬.৬৬ মিটার প্রতি সেকেন্ডের গতি পায়। সে ক্ষেত্রে ০.২৩ সেকেন্ডের মধ্যে উড়তে পারে মডেলটি। দু’টি লাফের মাঝে ডানা ঝাপটিয়েও সেকেন্ডে ৬.২৪ মিটার গতি পায় ম়ডেলটি। সে ক্ষেত্রে উড়তে সময় নেয় ০.৩৬ সেকেন্ড।
সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এরিক মেইলাকের মতে, “মাঝারি মাপের একটি আর্কিওপটেরিক্স তিনটি লাফ দিয়ে বা দু’টি লাফের মাঝে ডানা ঝাপটিয়ে ও়ড়ার জন্য প্রয়োজনীয় গতি (প্রতি সেকেন্ডে সাত মিটার) অর্জন করতে পারত।”
বস্তুত, আধুনিক পাখিরাও অনেক ক্ষেত্রে এ ভাবে একাধিক লাফে ওড়ে। তবে তা সব সময়ে নয়। চমকে উঠলে, মানসিক চাপে পড়লে বা কোনও হুমকির মুখে পড়লে একটি জোরালো লাফেই উড়ে যায় পাখিরা। তবে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতিতে অনেক সময়ে দুই বা তার বেশি লাফ দিতেও দেখা যায়।