Advertisement
E-Paper

মঙ্গলে নুড়িপাথর ঘাঁটতে গিয়ে ‘গুপ্তধন’ আবিষ্কার! রত্নপাথরের দুর্লভ খনিজ এল কোথা থেকে? বিস্মিত বিজ্ঞানীরা

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মঙ্গলে পারসিভারেন্স রোভার পাঠিয়েছিল নাসা। অভিযানের কেন্দ্রে ছিল মঙ্গলের জেজ়েরো ক্রেটার। ২০২৫ সালে সেখানেই পাওয়া কিছু পাথরে মিলেছে সম্পদের হাতছানি।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৫ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০৪
মঙ্গলগ্রহের লালমাটিতে রত্নপাথরের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

মঙ্গলগ্রহের লালমাটিতে রত্নপাথরের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: সংগৃহীত।

রুক্ষ প্রান্তর, নিষ্প্রাণ মাটি। তার মধ্যেই ইতিউতি ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কিছু নুড়িপাথর বিশ্লেষণ করতে বসেছিলেন বিজ্ঞানীরা। যা পাওয়া গেল, তা চমকপ্রদ! মঙ্গলগ্রহের লালমাটিতে মিলল ‘গুপ্তধনের’ হদিস!

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মঙ্গলে পারসিভারেন্স রোভার পাঠিয়েছিল আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। লাল গ্রহের পাথর ও মাটি পরীক্ষা করা, গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সংগ্রহ করা, অতীতে সেখানে জল ও আবহাওয়া কেমন ছিল, তা বিশ্লেষণ করাই ছিল পারসিভারেন্সের লক্ষ্য। এ ছাড়া, মঙ্গলে প্রাণের কোনও অস্তিত্ব থাকতে পারে কি না, তার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি রয়েছে কি না, এই রোভারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। নাসার এই অভিযানের কেন্দ্রে ছিল মঙ্গলের জেজ়েরো ক্রেটার। ২০২৫ সালে সেখানেই পাওয়া কিছু পাথরে মিলেছে সম্পদের হাতছানি।

মঙ্গলপৃষ্ঠে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার চওড়া বিশাল গর্ত জেজ়েরো ক্রেটার। দীর্ঘদিন ধরেই তা বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রে। পারসিভারেন্সের ক্যামেরায় সেখানে কিছু ফ্যাকাশে পাথর ধরা পড়েছিল। নিউ মেক্সিকোর লস অ্যালামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ভূ-রসায়নবিদ অ্যান ওলিলার নেতৃত্বে একটি দল সেই পাথর পরীক্ষা করে দেখেন। তাতে পাওয়া যায় করান্ডাম নামের বিশেষ এক ধরনের খনিজ পদার্থ, আক্ষরিক অর্থেই যা পৃথিবীতে ‘গুপ্তধন’ হয়ে উঠতে পারে।

চুনি এবং নীলকান্তমণির মতো মূল্যবান রত্নপাথর তৈরির সহায়ক খনিজ করান্ডাম। মঙ্গলের নুড়িপাথরে তা মিশে ছিল। চুনিকে তার স্বতন্ত্র লালচে গোলাপি আভা এনে দেয় ক্রোমিয়াম নামের একটি পদার্থ। মঙ্গলের পাথরে তা-ও পাওয়া গিয়েছে। এর আগে কখনও লাল গ্রহে এই ধরনের খনিজের সন্ধান মেলেনি। এমনকি, করান্ডাম যে সেখানে থাকতে পারে, বিজ্ঞানীদের কাছে সেটাই অপ্রত্যাশিত। লস অ্যালামোসের গবেষণাপত্রে লেখা হয়েছে, ‘‘অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ভাবে সুপারক্যাম বিশ্লেষণে তিনটি প্ল্যাজিওক্লেজ সমৃদ্ধ শিলার উপর ক্রোমিয়ামযুক্ত করান্ডামের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে।’’ এই সংক্রান্ত সম্পূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘জিয়োফিজ়িক্যাল রিসার্চ লেটার্‌স’ পত্রিকায়।

মঙ্গলের করান্ডাম নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গিয়েছে, লাল গ্রহের সঙ্কেত এবং পৃথিবীতে অবস্থিত মূল্যবান রত্নগুলির সঙ্কেতে আশ্চর্য রকমের মিল রয়েছে।

করান্ডাম মূল্যবান খনিজ বলেই যে মঙ্গলে তার উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ, তা নয়। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে অন্য কারণে। যে পরিস্থিতিতে করান্ডাম তৈরি হয়, তা মঙ্গলে দুর্লভ। সহজে তার ব্যাখ্যা মেলে না। গবেষণাপত্রে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছেন ওলিলা ও তাঁর সহকর্মীরা। লিখেছেন, ‘‘করান্ডাম তৈরির জন্য সাধারণত অ্যালুমিনিয়াম সমৃদ্ধ উপাদানের প্রয়োজন হয়, যাতে সিলিকনের ঘাটতি রয়েছে। উচ্চ তাপমাত্রায় সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই খনিজ উৎপন্ন হয়।’’ মঙ্গলে তাপের ঘাটতি না থাকলেও অ্যালুমিনিয়াম সমৃদ্ধ এবং কম মাত্রায় সিলিকনযুক্ত উপাদানের সহাবস্থান সেখানে কঠিন।

মনে রাখতে হবে, চুনি, পান্না বা নীলকান্তমণি মঙ্গলের জেজ়েরো ক্রেটারে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে নেই। তিনটি পৃথক পাথরখণ্ডে লেজ়ার রশ্মি ফেলে তার মধ্যে আটকে থাকা ক্রোমিয়ামযুক্ত করান্ডামের উপস্থিতি জানা গিয়েছে মাত্র। পৃথিবীর রত্নপাথরগুলির সঙ্গে তার তুলনা করে বিজ্ঞানীরা চমৎকৃত হয়েছেন।

এখন প্রশ্ন, মঙ্গলে করান্ডাম এল কোথা থেকে? বিজ্ঞানীদের একটি ব্যাখ্যা— উত্তপ্ত তরলের সঙ্গে ম্যাগমা বা শিলার মিথস্ক্রিয়া। কিন্তু ওলিলা এবং তাঁর সহকর্মীরা এই সম্ভাবনায় জোর দেননি। তাঁদের মতে, কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশে যে প্রবল সংঘর্ষ মঙ্গলে জেজ়েরো ক্রেটার তৈরি করে দিয়েছিল, রহস্য লুকিয়ে আছে সেখানেই। বড়সড় সংঘর্ষের ফলে শিলা প্রবল চাপ ও তাপের মুখে পড়ে। ভূত্বকের গভীরে তখন রূপান্তরিত খনিজ তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পৃথিবী ও চাঁদে সংঘর্ষের কারণে পরিবর্তিত শিলার মধ্যেও কিন্তু এই করান্ডামের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এ বার মঙ্গলও সেই তালিকায় যুক্ত হল।

গবেষকদের মতে, জেজ়েরো ক্রেটারের শিলাগুলির সঙ্গে উত্তপ্ত তরল পদার্থের মিথস্ক্রিয়ায় অ্যালুমিনিয়াম সমৃদ্ধ এবং স্বল্প সিলিকনযুক্ত রাসায়নিক তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তার ফলে করান্ডাম গঠন সহজ হয়েছে। উষ্ণ জল পাথরের ফাটলের মধ্যে দিয়ে চলাচল করার সময় করান্ডাম তৈরি হয়ে থাকতে পারে, মত বিজ্ঞানীদের। যে শিলাস্তরে করান্ডাম মিলেছে, তা যদি শনাক্ত করা যেত বা মঙ্গলের সেই পাথরের নমুনা যদি পৃথিবীতে নিয়ে আসা যেত, তবে এই সংক্রান্ত গবেষণা আরও সহজ হত।

mars Red Planet Space Science Scientific Research

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy