বাড়িতে টুকটাক কাজ সারছেন। তার মাঝে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে প্রবেশ করলেন, তার পরে ভুলেই গেলেন কেন সেখানে গিয়েছেন! এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ‘ডোরওয়ে এফেক্ট’ বলে পরিচিত ছিল। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করতেন, দরজার চৌকাঠ পার হলেই এটা হয়। দীর্ঘ দিন ধরে সেটা নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বলছে, চৌকাঠ পার হওয়াই উদ্দেশ্য ভুলে যাওয়ার কারণ নয়। ভুল হয়, কারণ পরিবেশ বদলায়। সেই সঙ্গে মাথায় থাকে অনেক চাপ।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যখন আমরা একটি দরজা দিয়ে চৌকাঠ পেরিয়ে অন্য ঘরে ঢুকি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক নতুন পরিবেশটিকে একটি ‘নতুন ঘটনা’ বলে ধরে নেয়। ফলে আগের ঘরের চিন্তাভাবনা বা স্মৃতিগুলি সাময়িক ভাবে পিছনে চলে যায় বা ‘রিসেট’ হয়ে যায়। কিছু ক্ষণ আগে কী ভাবছিল, সেই কথা ভুলে যায়।
২০০৬ সাল থেকে এই নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু করেন গ্যাব্রিয়েল র্যাডভানস্কি এবং তাঁর সহকর্মীরা। ধারাবাহিক ভাবে সেই গবেষণা চালিয়ে যান তাঁরা। ২০১০ এবং ২০১৬ সালে সেই নিয়ে গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেন। অস্ট্রেলিয়ার বন্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ডের বিজ্ঞানীরাও সেই গবেষণায় সহায়তা করেন। ২০২৩ সালে সেই সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছিল ‘সাইকোনমিক বুলেটিন’-এ।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ভার্চুয়াল বা কাল্পনিক কিছু বস্তু এক ঘর থেকে অন্য ঘরে বহন করে নিয়ে যেতে বলা হত। এর পরে তাঁরা ঠিক কী জিনিস বহন করছেন, তা পরীক্ষা করা হত। দেখা গিয়েছে, অংশগ্রহণকারীরা যখনই একটি দরজা পেরিয়ে দ্বিতীয় ঘরে ঢুকতেন, তখনই তাঁদের সেই জিনিসটি মনে করার ক্ষমতা বা স্মৃতিশক্তি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যেত। গবেষকেরা মনে করেন, এর নেপথ্যে রয়েছে ‘ইভেন্ট সেগমেন্টেশন’ তত্ত্ব। কী সেই তত্ত্ব? গবেষকদের মতে, আমাদের মস্তিষ্ক জীবনের অভিজ্ঞতাগুলিকে আলাদা আলাদা ছোট পর্বে ভাগ করে গুছিয়ে রাখে। যখনই আমরা কোনও সীমানা বা দরজা পার হই, মস্তিষ্ক আগের পর্বের ফাইলটি বন্ধ করে নতুন একটি ফাইল খোলে। ফলে আগের ফাইলের বিষয়বস্তু দ্রুত মনে করা বা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই গবেষণা করতে করতে ২০২১ সালে বাওম্যান নতুন এক তথ্য খুঁজে পান। তাঁর মতে, ‘ডোরওয়ে এফেক্ট’ আমাদের স্মৃতির কোনও স্থায়ী বা স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নয়। বরং এ রকম তখনই ঘটে, যখন সেই মানুষের মস্তিষ্ক আগে থেকেই অতিরিক্ত তথ্যের চাপে বা মানসিক ভাবে কিছুটা দুর্বল বা ক্লান্ত থাকে।
বিজ্ঞানীদের একাংশের দাবি, যখন কেউ একই রকম দেখতে একটি ঘর থেকে অন্য ঘরে যান, তখন কিন্তু তাঁর এতটা ভুল হয় না। কারণ, মস্তিষ্ক সেটিকে আলাদা প্রেক্ষাপট হিসাবে গণ্য করে না। বিজ্ঞানীদের মতে দরজা পার হওয়াটাও কোনও কারণ নয়। দরজা পার হয়ে পরিবেশের যে বদল ঘটে, তাতেই মানুষের ভ্রম তৈরি হয়। বাওম্যান বিপণি দিয়ে বিষয়টিকে বুঝিয়েছেন। কেউ যদি লিফটে চড়ে দোকানের এক তলা থেকে অন্য তলায় যান, তবে তাঁর স্মৃতিতে কোনও প্রভাব না-ও পড়তে পারে কারণ, দু’টি তলার পরিবেশ একই রকম। কিন্তু কেউ যখন দোকান থেকে বার হয়ে সরাসরি পার্কিংয়ে যান, তখনই হয়তো ভুলে যান যে ঠিক কী কেনার জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:
মাথার এই কাজ করার ধরন কিন্তু কোনও ত্রুটি নয়। বাওম্যানের মতে, স্মৃতিকে আলাদা আলাদা কক্ষে ভরে রাখে মস্তিষ্ক। তাতে তার স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। আমরা প্রতিদিনের নানা অভিজ্ঞতা যে ভাবে সহজে বুঝতে ও গুছিয়ে রাখতে পারি, তার নেপথ্যে এই প্রক্রিয়ার বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই মাঝেমধ্যে কোনও ঘরে প্রবেশের সময় উদ্দেশ্যটা ভুলে যাওয়া আসলে ত্রুটি নয়। মাথা যে ভাবে কাজ করে, সেই পদ্ধতির মাশুল আমাদের দিতে হয়।
‘ডোরওয়ে এফেক্ট’ নিয়ে বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। কোনও গবেষক এটিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কেউ বলেন, এই কারণেই মানুষ এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলে ভুলে যায় উদ্দেশ্য। বাওম্যানের মতে, এক সঙ্গে অনেক কাজ করার চেষ্টা আসলে স্মৃতিকে দুর্বল করে দেয়। মস্তিষ্কের উপর অতিরিক্ত তথ্যের চাপ থাকলেই কেবল এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতাটি দেখা যায়।