একটা সময় দেখে মনে হচ্ছিল, সেই একই ছবি আরও এক বার দেখা যাবে। দুই ওপেনার সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা যে শুরুটা করেছিলেন, তার পর একের পর এক উইকেট হারিয়ে নিজেদের উপর নিজেরাই চাপ বাড়িয়ে তুলেছিল ভারত। কিন্তু শ্রেয়স আয়ার অধিনায়কের ইনিংস খেললেন। তাঁকে সঙ্গ দিলেন অক্ষর পটেল, নমন ধীরেরা। শেষ মুহূর্তে চাপের মুখে ঝোড়ো ইনিংস খেললেন নমন। তাঁকে দেখে মনে হল, এই ফরম্যাটের জন্য পুরোপুরি তৈরি তিনি। ফলে শ্রেয়স আউট হয়ে গেলেও ক্রাইস্টচার্চে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২২৬ রান তাড়া করে জিতল ভারত। টি-টোয়েন্টিতে এটি ভারতের সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়। বোলারদের ব্যর্থতা ঢেকে কোচ গৌতম গম্ভীরের মুখরক্ষা করলেন সঞ্জু, শ্রেয়সেরা।
ম্যাট হেনরির বলে ছক্কা মেরে খেলা শেষ করলেন নমন। দু’বল বাকি থাকতে ম্যাচ জিতে গেল ভারত। কিন্তু গোটা ইনিংস একই রকম হয়নি। একটা সময় মনে হয়েছিল, নিউ জ়িল্যান্ডের দুই স্পিনার মিচেল স্যান্টনার ও মাইকেল ব্রেসওয়েলের সামনে খেই হারিয়েছে তারা। সেখান থেকেই পাল্টা লড়াই শ্রেয়স, নমনদের।
এর আগে টি-টোয়েন্টিতে ভারত সর্বাধিক ২০৯ রান তাড়া করে জিতেছিল। ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। কয়েক দিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে ২২২ রান তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভাল করেও হারতে হয়েছিল। কিন্তু এই ম্যাচে তা হল না।
২২৬ রান তাড়া করতে নেমে বিধ্বংসী ইনিংস খেললেন ভারতের দুই ওপেনার অভিষেক ও সঞ্জু। কিউয়ি পেসারদের বলের গতির ব্যবহার শুরু করেন তাঁরা। শুরুতে বেশি বড় শট খেলছিলেন সঞ্জু। একটা সময় অভিষেকও হাত খোলা শুরু করেন। লকি ফার্গুসনের বলে চতুর্থ ওভারে ২২ রান নেয় ভারত। সেখানেই খেলা ভারতের দিকে ঝুঁকে যায়।
নিউ জ়িল্যান্ডের স্পিনারেরা বল করতে আসার পর ছবিটা বদলায়। পাওয়ার প্লে-র শেষ ওভারে ১২ বলে ২৯ রান করে ব্রেসওয়েলের বলে আউট হন অভিষেক। প্রথম ৬ ওভারে ৯৪ রান করে ভারত। তার পরেই একটি ভুল করেন কোচ গম্ভীর। তিন নম্বরে ঈশান কিশনকে না নামিয়ে তিলক বর্মাকে নামিয়ে দেন তিনি। তখন ভারত দ্রুত রান করছিল। ঈশানের মতো মারকুটে ব্যাটারের সেটাই আসল জায়গা। কোন বুদ্ধিতে যে গম্ভীর তিলককে নামালেন তা বোঝা গেল না।
ভারতীয় দলে তিলকের ভূমিকা ফিনিশারের। কিন্তু তিন নম্বরে নেমে চাপে পড়েন তিনি। বল নষ্ট করতে শুরু করেন। তখনই বড় ধাক্কা খায় ভারত। ৩৩ বলে ৬৭ রান করে স্যান্টনারের বলে প্লেড-অন হন সঞ্জু। পরের ওভারে ব্রেসওয়েলের বলে আউট হন তিলক। ১১ বলে ৬ রান করেন তিনি।
পাঁচ নম্বরে নেমে ঈশান কিছু করতে পারেননি। তাঁর স্বাভাবিক খেলা খেলতে যান। বড় শট মারতে গিয়ে ১ রানের মাথায় সাজঘরে ফেরেন। বিনা উইকেটে ৯৩ রান থেকে ১২২ রানে ৪ উইকেট পড়ে যায় ভারতের।
সেখান থেকে দলকে টানেন শ্রেয়স ও অক্ষর পটেল। শ্রেয়স জানতেন, তাঁকে শেষপর্যন্ত থাকতে হবে। অক্ষর ১৪ বলে ২৪ রান করেন। কেন অভিষেকের পর টানা ম্যাচ খেলছেন নমন, তা এই ম্যাচে দেখালেন তিনি। বলা যেতে পারে, আরও এক জন ফিনিশার পেল ভারত।
শ্রেয়সের সঙ্গে দলকে জয়ের পথে নিয়ে গেলেন নমন। যে স্যান্টনার প্রথম তিন ওভারে মাত্র ২০ রান দিয়েছিলেন, তিনিই শেষ ওভারে দিলেন ১৯ রান। শেষ ১২ বলে দরকার ছিল ১৬ রান। ঠিক তখনই অযথা হাওয়ায় শট মেরে আউট হন শ্রেয়স। ২৮ বলে ৪২ রান করেন তিনি। তাতে অবশ্য ভারতের জয় আটকায়নি। শেষ ওভারে ৮ রান দরকার ছিল। চার, ছক্কা মেরে খেলা শেষ করে দেন নমন। ১৫ বলে ৪২ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি।
ভারতকে সুবিধা করল নিউ জ়িল্যান্ডের ফিল্ডিং। পাঁচটি ক্যাচ পড়ল। তার খেসারত দিতে হল স্যান্টনারদের। তবে ফিল্ডিংয়ের নিরিখে ভারতকেও বেশি নম্বর দেওয়া যাবে না। দুই দলই খারাপ পারফরম্যান্স করল এ দিন।
আরও পড়ুন:
শ্রেয়সেরা বোলারদের ব্যর্থতা আপাতত ঢেকে দিলেও গম্ভীরের চিন্তা গেল না। আরও এক বার ২০০ রানের বেশি দিলেন বোলারেরা। কাউকেই দেখে মনে হল না, ছন্দে রয়েছেন।
এই ম্যাচে সকলের নজর ছিল ভুবনেশ্বর কুমারের উপর। চার বছর পর ভারতীয় দলে ফিরে তিনি কেমন বল করেন, তার দিকে নজর ছিল। শুরুটা ভাল করেন ভুবি। নতুন বলে প্রথম ওভারে দেন মাত্র ৪ রান। বল দু’দিকেই সুইং করছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ওভারেই লাইন ও লেংথ নষ্ট হয়ে গেল। দিলেন ১৭ রান। যে কাজের জন্য তাঁকে নেওয়া হয়েছে সেটাই করতে পারলেন না। নতুন বলে উইকেট তুলতে পারলেন না। তাতে সমস্যা হল ভারতের।
ডেথ ওভারে দ্বিতীয় স্পেলে এসেও তেমন কিছু করতে পারেননি ভুবনেশ্বর। তাঁর বলের গতি কম। সুইংই অস্ত্র। পাশাপাশি বলের গতির হেরফের ভাল করেন। কিন্তু শেষ দিকে গ্লেন ফিলিপ্সের সামনে অসহায় দেখাল ভুবিকে। শেষ পর্যন্ত চার ওভারে ৪৯ রান দিলেন তিনি। একটিও উইকেট পাননি।
বাকি বোলারদেরও একই দশা। অর্শদীপ সিংহ চার ওভারে ৪৫ রান দিলেন। ময়ঙ্ক যাদব কিছুটা ভাল বল করলেন। চার ওভারে দিলেন ৪০ রান। একই রান দিলেন নীতীশ রেড্ডিও। সবচেয়ে খারাপ হাল অক্ষর পটেলের। চার ওভারে ৫৩ রান দিলেন তিনি।
এখানে ভারতের পরিকল্পনার অভাবও চোখে পড়ল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে প্রতি ম্যাচে বল করেছিলেন নমন। উইকেটও নিয়েছিলেন। কিন্তু এই ম্যাচে তাঁকে বলই দিলেন না শ্রেয়স। ফলে পাঁচ বোলারে খেলল ভারত। টি-টোয়েন্টি ম্যাচে পাঁচ বোলারে খেলা খুব কঠিন। বিকল্প না থাকলে সমস্যা। সেটাই হল।
ভারতের ফিল্ডিং আরও এক বার হতাশ করল। সহজ ক্যাচ ছাড়লেন অভিষেক। ২০২৬ সালে ভারত ৫৭টি ক্যাচ ফেলেছে। এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। পাশাপাশি হাতের তলা দিয়ে বল গলালেন প্রিন্স যাদব। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে এক রানের জায়গায় দু’রান হল। তাতে সমস্যা বাড়ল।
ভারতের বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের খামতি কাজে লাগিয়ে বড় রান করল নিউ জ়িল্যান্ড। ফিন অ্যালেন ২৪ বলে ৪৫ ও ফিলিপ্স ৪০ বলে অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংস খেললেন। তার পরেও অবশ্য জিততে পারল না নিউ জ়িল্যান্ড। ভারতীয় ব্যাটারদের দাপটে ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচ হারতে হল তাদের।