কিছু দিন বিরতির পর অবশেষে মুখ খুললেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কেন জাতীয় শিবির ছেড়ে গিয়েছিলেন, কেন কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে এবং কী ভাবে দু’বার কোচ তাঁর বিশ্বাস ভেঙেছেন, তার জবাব রোনাল্ডো দিয়েছেন ১৭৪০ শব্দের একটি চিঠিতে। সমাজমাধ্যমে সেই বার্তা পোস্ট করেছেন রোনাল্ডো।
পর্তুগালের অধিনায়কের দাবি, বিশ্বকাপের পর বিদায়বার্তা লিখে ফেলেছিলেন তিনি। ঠিক করেছিলেন, বিদায়ের দিন সে কথা প্রকাশ্যে আনবেন। কিন্তু বিশ্বকাপ শেষের পর সংস্থার প্রেসিডেন্ট তাঁকে অবসর না নেওয়ার অনুরোধ করেন। এর পর কোচ হিসাবে প্রস্তাব দেওয়া হয় জেসুসের নাম। রোনাল্ডো রাজি হন। পরে জেসুস তাঁকে ফোন করেন। রোনাল্ডোর সঙ্গে বৈঠক হয় এবং জেসুস বর্ণনা করেন, কী ভাবে রোনাল্ডোকে পর্তুগাল দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে তিনি দেখছেন।
সেই মতোই নেশন্স লিগের প্রথম এবং চতুর্থ ম্যাচে রোনাল্ডোকে খেলার প্রস্তাব দেন জেসুস। চেয়েছিলেন রোনাল্ডো লিসবনে প্রথম ম্যাচ খেলে সেখানেই থেকে যান। চতুর্থ ম্যাচে আবার দলের সঙ্গে যোগ দেন। রোনাল্ডো রাজি হননি। তাঁর দাবি, এতে খারাপ বার্তা যেত। নিজের যুক্তি স্পষ্ট করে বলেন কোচকে। কোচও রাজি হননি। গোটা কথাবার্তার সাক্ষী ছিলেন আল নাসেরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমো কুটিনহো। পরে রোনাল্ডোর বাড়িতে আবার একটি বৈঠক হয়।
প্রথম ম্যাচে রোনাল্ডো খেলেন। নরওয়ে ম্যাচের আগে মধ্যাহ্নভোজের সময় জেসুস সহকারীর মারফত রোনাল্ডোকে ডাকেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ৩০ মিনিটের জন্য খেলতে রাজি কি না। রোনাল্ডো সেই ম্যাচ খেলবেন না ধরেই মানসিক এবং শারীরিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। কোচের প্রস্তাবে কিছুটা বিস্মিত হলেও দলের কথা ভেবে রাজি হন। এর পর রোনাল্ডোকে ওয়ার্ম-আপ করিয়েও নামাননি। রোনাল্ডো লিখেছেন, ওখানেই প্রথম বার প্রতিশ্রুতি ভেঙেছিলেন কোচ।
নরওয়ে ম্যাচের ৪৮ ঘণ্টা পর কোচ এবং কুটিনহোর সঙ্গে রোনাল্ডোর আর একটি বৈঠক হয়। রোনাল্ডোর দাবি, ‘খুবই গভীর এবং সৎ কথাবার্তা’ হয়। রোনাল্ডো লিখেছেন, “আমরা রাজি হয়েছিলাম, একটা উপায়েই সমস্যা মেটানো যায়। কোচ ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছিলেন তা সাংবাদিক বৈঠকে বলবেন। সত্যিটা প্রকাশ্যে আনবেন। উনি জানাবেন যে আমি কখনও ম্যাচটা খেলার ইচ্ছাপ্রকাশ করিনি। কোচই অনুশীলনের সময় আমাকে খেলানোর ভাবনাচিন্তা করেছিলেন। ওয়ার্ম-আপ করিয়েও আমাকে না খেলানো যে ওঁর ভুল হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা চাইবেন। ভবিষ্যতে আর এমন হবে না, এই প্রতিশ্রুতিও দেবেন।”
রোনাল্ডো জানিয়েছেন, একটি নথিও তৈরি হয় যা তিনি নিজে দেখে অনুমতি দিয়েছিলেন এবং কোচের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আটটি পয়েন্টের সেই নথিতে কোচ সাংবাদিক বৈঠকে কী কী বলবেন, তা বিস্তারিত লেখা হয়েছিল। সেখানে কোচের ক্ষমা চাওয়া, না খেলানোর ভুল এবং রোনাল্ডোর স্তুতি ছিল। কিন্তু সাংবাদিক বৈঠকে কিছুই বলেননি জেসুস। রোনাল্ডোর দাবি, দ্বিতীয় বার প্রতিশ্রুতি ভেঙেছিলেন কোচ।
রোনাল্ডো লিখেছেন, “আরও একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি আবার তা ভাঙা হয়, তার অপেক্ষা না করে আমি জাতীয় শিবির ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার কাছে সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল বিশ্বাস। তা যতই কঠিন হোক, সত্যটা যাতে আমায় বলা হয় সেটাই চেয়েছিলাম। সাংবাদিক বৈঠকের আগের সকালে পর্তুগিজ় ফুটবল সংস্থার সভাপতির সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছিলাম, ওরা যদি আমার উপস্থিতি না চান, তা হলে বলে দিতে পারেন। আমি সেটা মেনেও নিতাম। কেউ তাতে রাজি হননি। সকলে একজোটে বলেছিলেন, জাতীয় দলে এখনও আমার জায়গা রয়েছে।”
রোনাল্ডো লিখেছেন, ২৫ বছরের ফুটবলজীবনে কখনও কোনও কোচের কৌশল এবং টেকনিক্যাল সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেননি। কিন্তু প্রতিশ্রুতিভঙ্গ করার পর তাঁর মনে হয়েছে, দলের সঙ্গে থাকা ঠিক হবে না। সতীর্থদের কাছে ক্ষমা চেয়ে রোনাল্ডো জানিয়েছেন, দায় তাঁর একার। সমর্থকদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, যে মুহূর্তে মনে হয়েছে তিনি থাকলে দলের ক্ষতি হবে, তখনই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে এসেছেন।
রোনাল্ডো লিখেছেন, “আমি যা করেছি তা খতিয়ে দেখা উচিত পর্তুগিজ ফুটবল সংস্থার এবং আমাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। কোনও ভাবেই সেই শাস্তি যেন কম না হয়। আমি সাধারণ ফুটবলার নই, দলে অধিনায়ক। সেটাই অনেক বড় ব্যাপার। আগেই ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু খারাপ কাজ করলে যে শাস্তি পেতে হবে সেটা জানি। বিশ্বফুটবলে যারা খেলে তারা জানে নিয়ম সকলের জন্য এক, সে যত বড় ফুটবলারই হোক না কেন।”
আরও পড়ুন:
রোনাল্ডো আরও লিখেছেন, “যখন ক্ষুধার্ত থাকতাম, খাবার জন্য কিছুই থাকত না। তখন থেকে একটা জিনিস শিখেছি, কেউ কাউকে বিনামূল্যে কিছু দেয় না। সকল সমর্থক এবং পর্তুগিজ়দের একটা প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, আমার বিদায়ী ম্যাচ হবে। তার জন্য সময় আছে।”
পর্তুগালের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার উল্লেখ করে রোনাল্ডো লিখেছেন, “জাতীয় দলের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার কথাই মাথায় আসে। বাবার মৃত্যুর সময় জাতীয় দলের অনুশীলনে ছিলাম। পরের দিন ম্যাচ পর্যন্ত দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেটা করেছিলাম শুধু দেশের কথা ভেবে। ক্লাবের হয়ে খেললে কখনও করতাম না। এখন আমি ফিট। ক্লাবের হয়ে খেলব এবং গোলও করব। আমাকে যা-ই শাস্তি দেওয়া হোক না কেন, জাতীয় দলে ফেরার জন্য আমি সব সময় তৈরি থাকব।”