‘বিগ বস্’ শুরু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রস্তাব এসেছিল। শো শুরুর তিন দিন আগে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন দীপেন্দু বিশ্বাস। দেড় মাস পর বুধবার ষষ্ঠ প্রতিযোগী হিসেবে বেরিয়ে যেতে হয়েছে ‘বিগ বস্’-এর বাড়ি থেকে। মাঝরাতে ফিরেছেন কলকাতায়। হঠাৎ বেড়ে যাওয়া জনপ্রিয়তা দেখে বিস্মিত হয়েছেন নিজেই। বিমানবন্দরে মাঝরাতেই বহু মানুষের সই, নিজস্বীর আবদার মেটাতে হয়েছে। কলকাতায় ফিরে গত কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রাক্তন ফুটবলার সাক্ষাৎকার দিলেন আনন্দবাজার ডট কম-কে।
প্রশ্ন: সকলে কিন্তু আপনারই সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করছে। আপনার শান্ত, নম্র স্বভাব সকলের মন জয় করে নিয়েছে।
দীপেন্দু বিশ্বাস: সেটাই তো দেখছি। ওখানে তো ফোন ছিল না। ফলে কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। বাড়ি ফিরে এসে ফেসবুক, হোয়াট্সঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম চালু করলাম। লোকে এত মেসেজ করেছে, ভাবতে পারছি না। সকলকে জবাব দিতে পারছি না। সকলে ভালবেসেছে। এই ভালবাসাটাই আমার পুরস্কার। সেটা নিয়েই ফিরেছি।
প্রশ্ন: খেলার জগতের লোক হয়ে বিগ বস্-এর মতো একটা রিয়্যালিটি শোয়ে কেন গেলেন?
দীপেন্দু: যাওয়ার কোনও ঠিকই ছিল না। শো শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ আগে, ২৪ অগস্ট আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। দু’দিন সময় নিয়ে ২৭ তারিখ নির্মাতাদের ‘হ্যাঁ’ বলি। আসলে ওঁরা বারবার চাইছিলেন, বাংলার ‘বিগ বস্’-এ কোনও ফুটবলার থাকবে না, সেটা কী করে হয়! ফুটবলই তো বাঙালির সেরা খেলা। আমি শেষ মুহূর্তে রাজি হয়েছি।
প্রশ্ন: কোনটা সহজ? ফুটবল না রিয়্যালিটি শো?
দীপেন্দু: অবশ্যই ফুটবল। মাঠের খেলাটা আমার জন্য অনেক সহজ। সারা জীবন প্র্যাকটিস করেছি। মাঠে গিয়েছি। জানি মাঠে নেমে কী করে খেলতে হয়। কিন্তু এই রিয়্যালিটি শো-র মাঠটা একেবারে নতুন।
প্রশ্ন: দেড় মাস থাকলেন বিগ বস্-এর বাড়িতে। ফিরে এসে কি ক্লান্ত লাগছে?
দীপেন্দু: একেবারেই ক্লান্ত লাগছে না। গত দেড় মাসে আমার ফিটনেস বেড়ে গিয়েছে। ‘বিগ বস’-এর বাড়িতে রোজ অন্তত ৪০ মিনিট করে হেঁটেছি। বাকিরা (প্রতিযোগীরা) বিভিন্ন টাস্কে আমার ফিটনেস দেখে ভয় পেয়ে যেত। তাই মোটেই ক্লান্ত নই।
ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাস। ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: দেড় মাসের অভিজ্ঞতা কী?
দীপেন্দু: সম্পূর্ণ অন্য রকম অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি। এত জন লোকের সঙ্গে এত দিন ধরে চার দেওয়ালের মধ্যে থেকেছি। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হচ্ছে। কখনও আবার ঝগড়াও হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা আগে হয়নি।
প্রশ্ন: আপনার পরিকল্পনা কী ছিল?
দীপেন্দু: কোনও স্ট্র্যাটেজি ছিল না। থাকবে কী করে? সময়ই তো পাইনি। আর বাইরে বেরিয়ে দেখলাম যাদের সঙ্গে এই ক’দিন খেলেছি, তাদের প্রায় সকলেরই পিআর (জনসংযোগ) টিম আছে। আমার তো তা-ও নেই। পরিবারের লোক, বন্ধুবান্ধবেরা সাপোর্ট করেছে। আমার একটাই পরিকল্পনা ছিল, শো থেকে বেরোনোর পর যেন কেউ আমাকে খারাপ না বলতে পারে। এখন দেখছি, সেটা পেরেছি।
প্রশ্ন: আপনার লক্ষ্য কী ছিল? এত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে, ভেবেছিলেন?
দীপেন্দু: খারাপ লাগছে। ভেবেছিলাম আরও কিছু দিন থাকব। কিন্তু এই খেলার ফরম্যাটটাই এরকম। কাউকে না কাউকে তো নিয়ম করে বেরিয়ে যেতে হয়।
প্রশ্ন: আপনিই প্রথম, যিনি সপ্তাহের মাঝে বাদ পড়লেন। এটা ভেবেছিলেন?
দীপেন্দু: ভাবিনি। আমার বেরিয়ে যাওয়াটা বাকিদের মতো দর্শকের ভোটে হয়নি। এটা দর্শকের বিচারে হলে দুঃখ থাকত না।
প্রশ্ন: কোথায় সমস্যা হল, কোথায় আপনার খামতি ছিল?
দীপেন্দু: খামতি ঠিক বলব না। আমি মানুষটাই এরকম। যাদের চিনি না, তাদের সঙ্গে তো হঠাৎ করে খারাপ ব্যবহার করতে পারি না। প্রথম চার-পাঁচ দিন লেগেছে সকলকে বুঝতে। আমি প্রত্যেকটা টাস্কে ১০০ শতাংশ দিয়েছি। ক্যাপ্টেন যা বলেছে, সব করেছি। আমি তো খেলার জগতের লোক। সেই কারণেই এটা করতে পেরেছি। এটাই তো আমার স্বভাব। মাঠে তো বরাবর ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পালন করেছি। নিজের কোনও খামতি খুঁজে পাইনি।
প্রশ্ন: শুরুতেই আপনাকে ডাগ আউটে পাঠিয়ে দেওয়া কতটা ধাক্কা দিয়েছিল?
দীপেন্দু: খুব রাগ হয়েছিল। কারণ, ‘অযোগ্য’ বলে ডাগ আউটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম সপ্তাহে আমাদের ক্যাপ্টেন ছিল ভরতদা (অন্যতম প্রতিযোগী ভরত কল)। পরে ভরতদাকে চিঠিতে লিখেওছিলাম, কেন আমাকে অযোগ্য বলা হল। ওর বিরুদ্ধে এটা আমার অভিযোগ। তবে আমার জন্মদিন যে ভাবে সকলে সেলিব্রেট করেছে, খাওয়ানো হয়েছে, সেটা ভাল লেগেছে। ক্যামেরার সামনে বলেওছিলাম, সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
প্রশ্ন: একটা ঘরের মধ্যে বিভিন্ন জগতের পরিচিত বা অপরিচিত লোকের সঙ্গে সারাদিন থাকা কতটা চ্যালেঞ্জের?
দীপেন্দু: বিশাল চ্যালেঞ্জ। শুধু দুর্নিবার (সাহা)-কে আগে থেকে চিনতাম। ও বারাসতের, আমি বসিরহাটের। মনামী (ঘোষ)-ও বসিরহাটের মেয়ে। কিন্তু ও কলকাতাতেই থাকত। ফলে দেখা-সাক্ষাৎ বেশি হয়নি। ভরতদাকে কয়েকটা শোয়ে দেখেছি, কথা হয়েছে। বাকি সকলেই অপরিচিত। আরও একটা ব্যাপার আছে। ওখানে ঘ়ড়ি নেই, ফোন নেই। সময় বুঝতে পারতাম না। শুধু সকালে গান বাজলে বুঝতাম ঘুম থেকে উঠতে হবে। রাতে আলো নিবলে বুঝতাম ঘুমোতে হবে।
প্রশ্ন: একবারই উত্তেজিত হয়েছিলেন। কিন্তু পুরো শোয়ে চুপচাপ লাগল। নিজেকে কি আটকে রেখেছিলেন? না কি আপনি বাইরেও এরকম?
দীপেন্দু: আটকে রাখিনি। দু’বার উত্তেজিত হয়েছিলাম। এক বার সোফা সরানোর সময়, আর এক বার রাজবীর (দে) যখন আমাকে ভেড়া বলেছিল। কিন্তু কেউ কিছু বললে পাল্টা চিৎকার করে তাকে কিছু বলা বা তার দিকে তেড়ে যাওয়া আমার স্বভাবে নেই। মাঠে তো ডিফেন্ডারেরা কত বার আটকেছে, বিশ্রী ট্যাকল করেছে। এক বার ১৩টা সেলাই পড়েছে। তাই বলে কি ডিফেন্ডারকে মারতে গিয়েছি? আমার লক্ষ্য থাকত শুধু গোল করা। এখানেও সকলের সঙ্গে ভাল ভাবে থাকতে চেয়েছি। কেউ খুব খারাপ কথা না বললে তার সঙ্গে ঝমেলা-ঝগড়ায় যাইনি।
প্রশ্ন: আপনার মতে এই বিগ বস্-এর বাড়িতে সেরা চরিত্র কে?
দীপেন্দু: সেরা বলা মুশকিল। এক এক জন এক এক রকমের। কেউ এই ঝগড়া করছে, আবার দু’মিনিট পর ‘সরি’ বলছে। সাত-আট জন অভিনেতা রয়েছে। তারা অভিনয় করছে, না কি আসল খেলছে, আমার পক্ষে বোঝা মুশকিল। আলাদা করে এক জনকে বাছা কঠিন।
প্রশ্ন: সবচেয়ে চালাক কে? বুদ্ধি দিয়ে সবচেয়ে ভাল খেলছেন কে?
দীপেন্দু: ভরত কল।
প্রশ্ন: সবচেয়ে খারাপ কাকে লেগেছে?
দীপেন্দু: খারাপ সেরকম কাউকেই লাগেনি। রাজবীরের সঙ্গে দু’বার ঝামেলা হয়েছিল। কিন্তু সেই রাজবীরের সঙ্গেই একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। ও এক বার ভাতের মাড় ফেলতে গিয়ে গোটা ভাতটাই ফেলে দিয়েছিল। একমাত্র আমিই সেখানে ছিলাম। ও আমাকে কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, দাদা, এটা দেখলে তো সকলে আমাকে খেয়ে ফেলবে। ওকে বললাম, চুপচাপ ভাতটা প্যাকেটে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দে। কাউকে কিছু বলব না। এই ঘটনাটা ওই বাড়িতে কেউ জানে না। এখানেই প্রথম বললাম।
প্রশ্ন: কিন্তু অনেকেই তো রাজবীরকে সমালোচনায় ভরিয়ে দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, উনি বার বার অসভ্যতা করছেন।
দীপেন্দু: রাজবীর এরকমই। বুঝলাম এটাই ওর স্ট্র্যাটেজি। ও চিৎকার করে, আবার ভাল ভাবে কথাও বলে। মনে হয়েছে এটাই ওর খেলা। ও এ ভাবেই খেলতে চায়।
প্রশ্ন: সেরা ঘটনা কোনটা?
দীপেন্দু: বেশ কয়েকটা আছে। টার্বাইন ঘোরানোর একটা টাস্ক ছিল। দু’ঘণ্টা ধরে ঘুরিয়েছি। একটা সাইকেল চালানোর টাস্ক ছিল। সেটাও দীর্ঘক্ষণ করেছি। ঘড়িতে চোখ রাখলে অতক্ষণ হয়তো পারতামই না। গার্ডেন এরিয়াটা খুব নোংরা ছিল। সেটা পরিষ্কার করেছি। প্রত্যেকটাই মনে রাখার মতো ঘটনা।
প্রশ্ন: কোন ঘটনা সবচেয়ে খারাপ লেগেছে?
দীপেন্দু: সৃজলা (গুহ)-কে ঘোড়া থেকে ফেলে দেওয়া। ওটা না হলেই ভাল হত। খুব আঘাত দিয়েছিল আমাদের সকলকে।
প্রশ্ন: সৃজলা ঘোড়া থেকে পড়ে আহত হওয়ার পর কি ওর পাশে আর একটু বেশি থাকতে পারতেন?
দীপেন্দু: শেষ দিন পর্যন্ত সৃজলার সঙ্গেই খেলেছি। আগেও দু’বার ওকে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। তখন ধরেছিলাম। কিন্তু যখন ও পড়ে গিয়েছিল, তখন একটু দূরে ছিলাম। ঘটনাটা ঘটার পর সঙ্গে সঙ্গে বরফ আনতে দৌড়েছিলাম। দেখলাম ওকে স্টোর রুমে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানেও গিয়েছিলাম। কিন্তু শুধু মহিলাদের থাকতে বলা হয়েছিল। আমি বেরিয়ে এসেছিলাম। সোহিনী (পাল) ছিল। ওই ঘটনার পর সকলে মানসিক ভাবে এতটাই ধাক্কা খেয়েছিল, কী বলব, বুঝতে পারছিলাম না। সৃজলা ফেরার পর আমরা ওকে অনেক সাহায্য করেছি। ওর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছে। ফুটবল খেলতে গিয়ে যেহেতু আমারও এরকম হয়েছিল, আমি বিষয়টা জানি। ওকে পরামর্শও দিয়েছি।
প্রশ্ন: সবচেয়ে ভাল বন্ধুত্ব কার সঙ্গে হয়েছে?
দীপেন্দু: দুর্নিবার। আগেও ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল। ওখানে গিয়ে সেটা আরও গাঢ় হয়েছে।
প্রশ্ন: ফাইনালে কোন ৫ জনকে দেখছেন?
দীপেন্দু: এটা নিয়ে কিছু বলা আমাদের বারণ।
প্রশ্ন: ‘বিগ বস্’-এর ঘরটাকে মিস্ করবেন?
দীপেন্দু: খুব মিস্ করব। আজ সকালে বাড়িতে কফি খাওয়ার পর কাপ ধুতে গিয়েছিলাম। বৌ বলল, এটা কী করছ! কী করব? অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে সঞ্চালক হিসেবে কেমন লাগল?
দীপেন্দু: খুব ভাল লেগেছে। দাদার দরবারে এসে দাদা বলেছে, ব্রাজ়িল খেলে গেল কলকাতায়, তুমি দেখতে পেলে না। আমিও ওখানে সকলকে বলছিলাম, ব্রাজ়িল কলকাতায় খেলবে, আর আমি এখানে। ফোরল্যানকেও দেখতে পেলাম না। তবে আজ শিল্ড ফাইনালে যাব। ডার্বি দেখব।
সঞ্চালক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীপেন্দু। ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: সৌরভ কিন্তু গত শনিবার আপনাকে এক বার সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তার পরেও খুব একটা ঝগড়া বা চিৎকারের মধ্যে দেখা যায়নি কেন?
দীপেন্দু: হ্যাঁ, দাদা গত শনিবার সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তিন দিনে নিজেকে আর কী বদলাব। আমি যে রকম, সে রকমই ছিলাম।
প্রশ্ন: বাড়ি ফেরার পর সকলে কী বললেন?
দীপেন্দু: সকলে বলেছে, খুব ভাল হয়েছে। ভাল খেলেছ। লোকে ভালবাসছে। আমার বিরুদ্ধে কেউ কোনও অভিযোগ করেনি। তার মানেই আমি ভাল ভাবে থেকেছি ‘বিগ বস্’-এর বাড়িতে।
প্রশ্ন: আবার কোনও রিয়্যালিটি শো করবেন?
দীপেন্দু: ভাবব। তবে না করার সম্ভাবনাই বেশি।