শুক্রবার সন্ধ্যায় সিসিএফসি (ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব)-তে হাজির জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা টেনিস তারকা আপ্লুত। কলকাতায় ব্রাজ়িল এবং উরুগুয়ে ফুটবল দলকে খেলানোর নেপথ্যে প্রধান দুই কারিগর সৌরভ চট্টোপাধ্যায় এবং অনুজ কিচলুকে দেখতে পেয়েই বললেন, ‘‘তোমরা যা করেছ, ভাবা যায় না। অভিনন্দন।’’
ভিনিসিয়স জুনিয়রের ব্রাজ়িল এবং দিয়েগো ফোরল্যানের উরুগুয়েকে যে সংস্থা কলকাতায় খেলাতে পেরেছে সেই ‘বেস্ট অফ ইউ’-এর দুই কর্ণধার সৌরভ এবং অনুজের মুখে তখন তৃপ্তির হাসি, স্বস্তির নিঃশ্বাস। চোখ-মুখ বলে দিচ্ছিল, গত চার মাসে কী ধকল, পরিশ্রম গিয়েছে তাঁদের। কিন্তু সেগুলোকে দশ গোল দিয়ে ফুটে বেরোচ্ছিল সাফল্যের আনন্দ।
দৃপ্ত গলায় দু’জনেই আনন্দবাজার ডট কম-কে বললেন, ‘‘কলকাতাকে দশে দশ দিয়ে গিয়েছেন ভিনিসিয়সেরা। ভারত কিন্তু ব্রাজ়িলের ফুটবল মানচিত্রে চিরকালের মতো জায়গা করে নিল। এরপর অস্ট্রেলিয়া, জাপানে খেলতে গেলে ওরা কিন্তু নিজে থেকেই বলবে ভারতের সঙ্গে খেলার কথা। কোনও সন্দেহ নেই, ব্রাজ়িল ভবিষ্যতে সুযোগ পেলেই আবার খেলতে আসবে।’’
অনুজ বললেন, ‘‘ব্রাজিল খুব অল্প সময়ের জন্য কলকাতায় ছিল। ১ অক্টোবর রাতে কলকাতায় এসে পরের দিন একটাই ট্রেনিং সেশন করেছিল। ৩ তারিখ ম্যাচ ছিল। তার মধ্যেও বিমানবন্দরে ইমিগ্রেসন থেকে শুরু করে কলকাতার খাবার, সংস্কৃতি, মানুষের ব্যবহার সব কিছু নিয়ে ওরা খুশি।’’
ভিনিদের খুশি করার কাজটা যে মোটেই সহজে হয়নি, তা সৌরভের কথায় পরিষ্কার। বললেন, ‘‘ব্রাজ়িলের যে প্রতিনিধিরা প্রথম এসেছিলেন, তাঁরা যুবভারতীর মাঠ দেখে একেবারেই খুশি ছিলেন না। ফলে আমাদের কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের এক সপ্তাহ আগে ওঁদের দেখে মনে হয়েছিল, হয়তো এ বার খুশি হয়েছেন। আর ম্যাচের পর ওদের গোটা দল খুশি।’’
ব্রাজ়িল এবং উরুগুয়ে দলের জন্য ব্যবস্থাপনায় খুশি সৌরভ-অনুজও। বললেন, ‘‘ব্রাজিল ম্যাচের সব আয়োজন সুষ্ঠু ভাবে হয়েছে। নতুন করে মাঠ তৈরি হয়েছে। ৫০ হাজারের উপর দর্শক ছিলেন মাঠে। স্টেডিয়ামটা ম্যাচের দিন খুব সুন্দর দেখিয়েছে।’’
এই জায়গায় দু’জনেই দরাজ সার্টিফিকেট দিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। প্রশংসা করলেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনেরও। বললেন, ‘‘রাজ্য সরকার, ফুটবল ফেডারেশন প্রচুর পরিশ্রম করেছে। ব্রাজ়িল এবং উরুগুয়ের ফেডারেশনের সঙ্গে অগুন্তি ভিডিয়ো কল হয়েছে, কনফারেন্স কল হয়েছে। প্রচুর প্ল্যানিং ছিল। আমরাও সরকারকে অনেকটাই গাইড করতে পেরেছি। কারণ, আমাদের বড় কনসার্ট, ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্ট আয়োজন করার অভিজ্ঞতা আছে। তাই সরকার বা ফেডারেশনের এত বড় ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা না থাকলেও অসুবিধে হয়নি। স্টেডিয়ামকে সাজিয়ে তোলার কাজ সরকার করেছে। সিটে নম্বর বসেছে। মাঠে ওই দিন জল, খাবার-সহ অন্য পরিষেবা নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি। সরকারই সব করেছে। ট্রাফিক ব্যবস্থা এতটাই ভাল ছিল, দলের যাতায়াতে কোনও সমস্যা হয়নি। ফুটবলারদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা দারুণ ভাবে করা হয়েছিল। মাঠ ছাড়াও নিরাপত্তা নিয়ে খুঁতখুঁতে ছিল দুই দল। কিন্তু ব্যবস্থা এতটাই ভাল ছিল যে, এক বারের জন্যও ওরা কোনও অভিযোগ করেনি।’’
ভয় যে একেবারে ছিল না, তা নয়। সৌরভের কথায় সেটা স্পষ্ট। বললেন, ‘‘সত্যি বলতে একটু নার্ভাস তো ছিলামই। যদিও আমাদের কাজ ছিল শুধু দুটো দলকে শহরে নিয়ে আসা, আয়োজনের বিষয়গুলো আমাদের দায়িত্বে ছিল না, কিন্তু ঘটনা হল, ব্রাজ়িল দল শুধু আমাদেরই চিনত। তাই আমাদেরই প্রাথমিক ভাবে দায়িত্ব ছিল, ওদের কমফর্ট, সেফটির ব্যবস্থা করা।’’
উরুগুয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে সৌরভ বললেন, ‘‘জাপান, কোরিয়ায় খেলে ওরা কলকাতায় এসেছিল। কিন্তু ওদের এখানে বেশি ভাল লেগেছে।’’ অনুজ বললেন, ‘‘এমনিতে জাপান, কোরিয়ায় ওরা তিন দিন করে ছিল। কলকাতায় ছিল ছ’দিন। সিটি ট্যুর করে দারুণ খুশি। ট্রেনিং ফেসিলিটি ওদের খুব ভাল লেগেছে।’’ সৌরভ জানালেন, ‘‘উরুগুয়ে দল ইডেনে ক্রিকেট খেলে দারুণ খুশি। রবিন সিং ওদের শিখিয়েছে কী করে ব্যাট, বল করতে হয়। ওরা ভারতের সংস্কৃতি, আতিথেয়তায় মুগ্ধ। ওরা সব সুপার স্টার। কিন্তু একেবারে মাটির মানুষ। শুধু নিছক দুটো ম্যাচ নয়, তার বাইরেও দু’দেশের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।’’
তবে ভালর তো কোনও শেষ নেই। সেই জায়গা থেকে অনুজ বললেন, ‘‘আমরা মাত্র চার মাস সময় পেয়েছিলাম। আরও সময় দরকার ছিল। ম্যাচ দুটোর আরও প্রচার দরকার ছিল। আরও হাইপ তোলা উচিত ছিল। তাহলে হয়তো আরও বেশি দর্শক মাঠে আসতেন। সংশ্লিষ্ট সকলের আরও আগে বসা উচিত ছিল। আরও পরিকল্পনার দরকার ছিল। আরও একটু সময় পেলে আরও ভাল হতো। স্পনসরদের আরও সময় দিতে হতো।’’
কলকাতা ছাড়ার আগে কার্লো আনচেলোত্তিরা (ব্রাজ়িল দলের কোচ) ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির জন্য একটি পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন। অনুজ বললেন, ‘‘ওঁরা বলেছেন, ভারতীয় ফুটবলারদের এবার বিদেশে খেলতে যাওয়া উচিত। সেখানকার টপ ডিভিশনে হয়তো নয়, কিন্তু তৃতীয় বা চতুর্থ ডিভিশনে হলেও খেলা উচিত। আফ্রিকার ফুটবলারেরা সেটাই করে। ইউরোপে বড় দেশে না হলেও ডেনমার্ক, নরওয়ে, লাটভিয়া, স্লোভেনিয়ায়র মতো দেশের লিগে খেলে। ভারতীয়েরা বিদেশের লিগে খেলে না শুনে ওঁরা অবাক হয়ে গিয়েছেন। বিদেশে খেলে এসে ফুটবলাররা জাতীয় দলে খেললে ভারতীয় ফুটবলেরই উন্নতি হবে। এটা নতুন কিছু নয়। এশিয়ার দেশগুলো এটা করে। চীন, ফিলিপিন্স তো নিয়ম করে ফুটবলারদের ইউরোপে খেলতে পাঠায়।’’
ব্রাজ়িল ম্যাচের আগে সৌরভ আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেছিলেন, এই ধরনের বড় দল আনার ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সাহায্য দরকার। দু’টি ম্যাচের পর সরকারি সাহায্য কি আসবে? অনুজ বললেন, ‘‘পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজ়িল অন্য রাজ্যে খেলতে না গিয়ে এখানে খেলেছে। এটা রাজ্যের গর্ব। কাল যদি স্পেন, ফ্রান্স আসে, সেটা তো রাজ্যেরই গর্ব। এটা তো এই রাজ্যে একটা বিনিয়োগ। সরকার যে পরিশ্রম করেছে, বোঝা গিয়েছে তাদের ক্ষমতা আছে।’’
পানামা, ব্রাজ়িল এবং উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ভারতের এই তিনটি ম্যাচ আয়োজন করা নিয়ে দু’টি প্রশ্ন উঠেছে। এক, এই ধরনের ম্যাচ করে আদৌ কোনও লাভ হবে ভারতীয় ফুটবলে? দুই, শোনা যাচ্ছে, এই দু’টি ম্যাচ আয়োজন করতে গিয়ে অনেক টাকা ক্ষতি হয়েছে। এই সব নেতিবাচক বিষয়কে উড়িয়ে দিলেন সৌরভ এবং অনুজ।
আর্থিক বিষয় নিয়ে অনুজ বললেন, ‘‘রাজ্যের গুডউইলের জন্য এই ধরনের ম্যাচ আরও দরকার। এসব ম্যাচ অমূল্য। সব তো টাকা দিয়ে বিচার হয় না। এই ধরনের ম্যাচ আয়োজন করতে গিয়ে সরকারকে জিজ্ঞেস করতে হয়, তারা কি আগ্রহী? একটা সময় আসুক যখন সরকার নিজে থেকে বলবে, আমরা এই ধরনের ম্যাচ করতে চাই।’’
সৌরভের মতে, ‘‘এটা শুধু রাজ্যের ক্রীড়া মন্ত্রকের ব্যাপার নয়। পর্যটন, শিল্প, তথ্য- সংস্কৃতি-সহ বিভিন্ন মন্ত্রকের ব্যাপার। এটা শুধু ফুটবলে সীমাবদ্ধ নয়।’’
প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সৌরভ বললেন, ‘‘ইউনিটি কাপে ভারতীয় দলের খেলা দেখে মনে হয়েছিল, একটু পরিশ্রম করলে এই দল পারবে। ফুটবলার, কোচিং স্টাফেদের আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছিল। পানাম ম্যাচে একটু ভাগ্য থাকলে জিতে যেতাম। যে পানামা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে কাঁদিয়ে ছেড়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দল সত্যিই ভাল খেলেছে।’’ অনুজ বললেন, ‘‘ব্রাজ়িলর বিরুদ্ধেও ভারত দারুণ খেলেছে। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে দল ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তিন দিনের মধ্যে দুটো কঠিন ম্যাচ খেলতে হয়েছে। উল্টো দিকে উরুগুয়ে বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছে।’’
অনুজের বক্তব্য, ‘‘কেউ কেউ বলছেন, দুটো ম্যাচ করতে গিয়ে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে, তা তৃণমূল স্তরের ফুটবলের উন্নতিতে কাজে লাগানো উচিত। আমার মতে, দুটোই দরকার। তৃণমূল স্তরে উন্নতি অবশ্যই দরকার। কিন্তু তারপর যদি র্যাঙ্কিংয়ে ১০০-১৫০ নম্বর দেশের সঙ্গে খেলতে হয়, তার তো কোনও মানে নেই। তৃণমূল স্তরে এই টাকাটা খরচ করলেই কি রাতারতি সব বদলে যাবে? মানুষের আগ্রহ বাড়াতে তারকাদের দরকার। সকলে গ্ল্যামার চায়। এখন ক্রিকেটে রঞ্জি ট্রফি কেউ দেখে? ভারতীয় ফুটবলে তারকা জন্মাবে। কিন্তু তাদের বড় বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলা তো দরকার। যাঁরা এসব বলছেন, তাঁরা ইতিবাচক দিকগুলো দেখছেন না। শুধু নেতিবাচক বিষয়গুলো দেখছেন।’’