অবশেষে কিছুটা স্বস্তি পেলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া বিদ্রোহ করলেও পাশে পেলেন আফ্রিকাকে। কনফেডারেশন অফ আফ্রিকান ফুটবলের (কাফ) সদস্য দেশগুলি সম্মিলিত ভাবে ইনফান্তিনোর পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকোর সমর্থনও আদায় করে নিয়েছেন কঠিন সময়ে। যদিও ফিফার মধ্যেই ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন সভাপতি। বিশ্বকাপ-সহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলি বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানতেন না ফিফার শীর্ষ কর্তারাও। দু’জন সেই প্রস্তাবে সই করতেই রাজি হননি।
আমেরিকার একটি সংবাদমাধ্যমে ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপ বিক্রির সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশিত হতেই সরব হয় ইউরোপের দেশগুলি। তীব্র বিরোধিতা করা হয়। ইউরোপের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা উয়েফার সদস্য দেশগুলি ফিফার সব প্রতিযোগিতা বয়টকের কথা জানায়। একই পথে হাঁটে উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার ফুটবল নিয়ামক সংস্থাও। চাপের মুখে ফিফাকে বলতে হয়, বিশ্বকাপ বিক্রি করার কোনও পরিকল্পনা নেই। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ায় পরে পরিকল্পনা বাতিল করার কথাও ঘোষণা করতে হয়। এর পরই ইনফান্তিনোকে পদচ্যুত করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে ইউরোপের দেশগুলি। তাতে ফিফা সভাপতির উপর চাপ আরও বাড়ে।
এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আফ্রিকার দেশগুলিকে পাশে পেলেন ইনফান্তিনো। ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে ‘কাফ’-এর অন্তর্ভুক্ত ৫৪টি দেশ। সংস্থার পক্ষে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘সংস্থার সর্বোচ্চ কমিটিতে সর্বসম্মত ভাবে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পাশে থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আফ্রিকার ফুটবলের উন্নতিতে ইনফান্তিনোর দীর্ঘ দিনের অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।’’ ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইসেস’ তৈরির প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার বিষয়টিকেও স্বাগত জানিয়েছেন কাফ সভাপতি প্যাট্রিস মতসেপে। তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা সুশাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতা রক্ষা ও মেনে চলার জন্য ফিফা, সদস্য সংস্থা, অন্যান্য ফুটবল কনফেডারেশন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে কাজ করে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’’ আফ্রিকার প্রভাবশালী ফুটবল কর্তারাও ব্যক্তিগত ভাবে বিবৃতি দিয়ে ইনফান্তিনোর ফিফার পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা হলেন মরক্কো ফুটবলের প্রধান তথা কাফের সহসভাপতি ফৌজি লেকজা, ফিফা কাউন্সিল সদস্য হানি আবো রিদা (মিশর), হামিদো জিব্রিলা (নাইজার) এবং আহমেদ ইয়াহিয়া (মৌরিতানিয়া)।
অন্য দিকে, আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকোকেও পাশে পেয়েছেন ইনফান্তিনো। ইউরোপ বিরোধিতা করলেও এই দু’দেশ ইনফান্তিনোকেই আরও এক দফা ফিফা সভাপতি পদে চায়। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘‘এএফএ-র কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে আমরা গত ১০ বছরের কাজকে সমর্থন জানাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী ফুটবলের উন্নয়ন, সুস্পষ্ট, স্থিতিশীল এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থাই ফিফার প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি।’’ ইনফান্তিনোকে সমর্থন করলেও আর্জেন্টিনা অবশ্য জানাতে ভোলেনি, তারা বিশ্বকাপ বিক্রির প্রস্তাবের পক্ষে ছিল না। এ নিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘স্বীকার করতেই হবে, এমন একটি প্রকল্প প্রত্যাহার করা হয়েছে যা ফুটবল মহলে প্রথম থেকেই নিশ্চয়তার চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।’’
ফিফা সভাপতি পদে আরও এক দফা চায় গত বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মেক্সিকোও। যদিও তারাও বিশ্বকাপ বিক্রির বিরোধী। সে দেশের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘‘প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করে ফুটবলের উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে এফএমএফ সমর্থন করে।’’
আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর দাবি, ইনফান্তিনোর বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা জানতেন না ফিফার সর্বোচ্চ কমিটির সদস্যেরাও। তাঁরাও বিষয়টি জানার পর চমকে যান। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটির দু’জন প্রস্তাবে সই করতে রাজি হননি। ফিফার মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রম, আইন বিভাগের প্রধান এমিলিয়ো গার্সিয়া এবং চিফ অফ স্টাফ ড্যান ও'টুল প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন। তবে সিইও কেভিন ল্যামোর এবং অর্থ বিভাগের প্রধান টমাস পেয়ার তীব্র প্রতিবাদ করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ইনফান্তিনোর প্রস্তাব পাস হয়ে যায়।
আরও পড়ুন:
ইনফান্তিনো ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইসেস’ নামে একটি সংস্থা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতাগুলির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হত এই সংস্থাকে। আশা করা হয়েছিল, প্রস্তাবিত সংস্থার অন্তত ২১ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি সংস্থার কাছে বিক্রি করা যাবে। এতে ফিফার পকেটে ৪০ হাজার কোটি টাকা ঢুকবে। ফিফা একটি বিবৃতিতে জানায়, ‘ফিফা ফাস্ট ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’ নামের একটি প্রকল্প চালু করা হবে। তার মাধ্যমে সরাসরি ওই ৪০ হাজার কোটি টাকা সদস্য দেশগুলির ফুটবল সংস্থাদের পাঠানো হবে। এই বিষয়ে ফিফার প্রধান পরামর্শদাতা সংস্থা ছিল জেপি মর্গ্যান। ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইসেস’ সংস্থাটির মাথায় বসার সম্ভাবনা ছিল জোশুয়া কুশনার। তিনি সম্পর্কে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই জারেড কুশনারের ভাই।