আর্থিক দুর্নীতির ১১৫টি অভিযোগ। তার মধ্যে ১১৪টিতেই তারা দোষী। টানা ৯ বছর ধরে একের পর এক আর্থিক দুর্নীতি করে গিয়েছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটি। তথ্য লুকিয়েছে। ফুটবলার এবং কোচেদের কত অর্থ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। আর্থিক খরচের নিয়ম ভাঙা হয়েছে অনায়াসে। দোষী প্রমাণিত হওয়ার পর প্রশ্ন উঠছে, এ বার কী হবে?
আর দু’সপ্তাহ পর প্রিমিয়ার লিগ ফের শুরু হবে। সেই প্রতিযোগিতাতেই প্রতারণার মামলায় অভিযুক্ত এবং দোষী সাব্যস্ত ম্যাঞ্চেস্টার সিটি রয়েছে এক নম্বরে।
শাস্তি ঘোষণার আগে অনেক সময় যাবে। ম্যাঞ্চেস্টার সিটি ধারাবাহিক ভাবে দোষ অস্বীকার করে যাবে এবং আবেদন করবে। তার মাঝে প্রিমিয়ার লিগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠবে।
এক দিকে যেমন প্রতিযোগিতার অন্যতম সফল দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তারা প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনই গত দু’দশক ধরে প্রিমিয়ার লিগে যে পরিমাণ অবিচার হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রচারকারীরা কি এখনও সিটির জয়ের মুহূর্ত বার বার দেখিয়ে প্রচার করবেন? ২০১২-য় শেষ মুহূর্তে সের্জিয়ো আগুয়েরোর গোল বা ২০১৯-এ ভিনসেন্ট কোম্পানির দুর্দান্ত সেই গোল কি প্রিমিয়ার লিগের সেরা মুহূর্ত হিসাবে আখ্যায়িত হবে, না কি সবচেয়ে খারাপ মুহূর্ত হিসাবে ধরা হবে?
যদি এনজ়ো মারেসকার দল এ ভাবেই জয়ের ধারা বজায় রাখে, তা হলে কী ভাবে পরের বছর মে মাসে প্রিমিয়ার লিগের ট্রফিতে নীল-সাদা রিবন বসাবেন আয়োজকেরা? প্রতিযোগিতার সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না?
এক কথায় বলা যায়, গত দশকে সবচেয়ে সফল ইংরেজ দল এখন জনপ্রিয়তার সঙ্কটে ভুগছে এবং এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
বিভিন্ন রকম শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে প্রিমিয়ার লিগের। সিটিকে পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা হতে পারে। প্রচুর অর্থ জরিমানা হতে পারে। অনেক পয়েন্ট কাটা যেতে পারে। এমনকি, পরের বার সিটি প্রিমিয়ার লিগে খেলবে কি না সেটা নিয়েও সংশয় দেখা দিতে পারে।
সিটিকে বিদ্রুপ করে লেখা বিলবোর্ড। ছবি: রয়টার্স।
সিটির প্রতি কোনও নরম মনোভাব দেখানোর সম্ভাবনা নেই। কারণ তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সিটির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার এবং বিভিন্ন সময়ে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই জাল এতটাই ছড়ানো যে, নিয়ম ভাঙার ফায়দা তোলা ফুটবলারেরা অনেকে এখন অবসরও নিয়ে ফেলেছেন।
আবেদন সম্পূর্ণ হওয়ার পরেও যদি সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তা হলে দলের মালিক এবং কর্মকর্তাদের ভবিষ্যত নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। এই ব্যাপারটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যাবতীয় অভিযোগের বিরুদ্ধে সিটি কেন নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এটি এমন একটি বিষয় যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভূরাজনৈতিক ইতিহাস, সংস্থার সুনাম এবং এই বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রভাবশালী মানুষদের নাম।
সিটির মালিক শেখ মনসুর বিন জায়ের আল নাহিয়ান। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভাই। শেখ মনসুর নিজেও আমিরশাহির ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং উপপ্রধানমন্ত্রী। সিটিকে শাস্তি দেওয়া মানে আমিরশাহি এবং আবু ধাবির শাসক পরিবারকেও শাস্তি দেওয়া।
সিটির মালিক শেখ মনসুর বিন জায়ের আল নাহিয়ান। ছবি: রয়টার্স।
সিটি বরাবর বলে এসেছে তাদের মালিকানা কোনও দেশের অধীন নয়। কিন্তু যে চুক্তি রয়েছে তার থেকে কোনও ভাবেই মুখ ফিরিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সিটির বোর্ডের চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারক হলেন শেখ মহম্মদের দীর্ঘ দিনের পরামর্শদাতা। আবু ধাবির সভারেন ওয়েলথ ফান্ড মুবাদালার মুখ্যকর্তা।
ক্লাবের স্টেডিয়াম এবং জার্সির স্পনসর এতিহাদ এয়ারওয়েজ, যাদের এক বোর্ড সদস্য এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এক্সপিরিয়েন্স আবু ধাবি এবং এতিসালাত হল সিটির স্পনসর।
সিটির চেয়ারম্যান আল মুবারক অবশ্য বলেছেন, “এই তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা প্রমাণ করে যাচ্ছি যে আমরা নির্দোষ। এই বিষয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাসও রয়েছে। অনেকেই এই ক্লাবকে ছোট করে দেখাতে চান। তাঁদের সেই সুযোগ দিতে চাই না।”
কিন্তু যদি চূড়ান্ত শাস্তি এখনকার মতোই থাকে, তা হলেও কি মালিকেরা দলের দায়িত্বে থাকবেন? যদি তারা না থাকেন, তা হলে কারা সিটির দায়িত্ব নেবেন, যে ক্লাব ইতিমধ্যেই লজ্জা কুড়িয়েছে?
গুয়ার্দিয়োলার হাতে ট্রফি। ছবি: রয়টার্স।
২০১৯-এ আমেরিকার সংস্থা ‘সিলভার লেক’ সিটির সংস্থার অংশীদারিত্ব কিনেছে ৪৮০০ কোটি টাকায়। তারাই বা কী বলছে? ল্যান্স আর্মস্ট্রং বা লস অ্যাঞ্জেলেস ক্লিপার্সের প্রতারণার সময় যে ভাবে স্পনসরেরা তাদের পাশে থেকেছিল, সিটির সময়েও থাকবে? জনপ্রিয়তা নষ্ট হওয়ার জন্য সহযোগী সংস্থাগুলি বেরিয়ে যাবে না তো?
যদি প্রিমিয়ার লিগ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা হারায় সিটি, তা হলে ফুটবলারেরা ক্লাবে থাকবেন তো? পূর্ব ম্যাঞ্চেস্টারে আমিরশাহি যে বিনিয়োগ করেছে তারই বা কী হবে?
উল্লেখ্য, সিটি ফুটবল গ্রুপের অধীনে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির মতো বিশ্বের অনেক ফুটবল ক্লাব রয়েছে। তারা ম্যাঞ্চেস্টারের একটি অংশে ১ লক্ষ ২৭ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তার মধ্যে এক শিল্প সংস্থার ৮০ একরের দূষিত জমিকে বদলে ক্লাবের অনুশীলনের মাঠ তৈরি করেছে। পাঁচ একর দান করেছে সমাজসেবার অংশ হিসাবে।
আমিরশাহির বিনিয়োগকারীরা শহরের একাধিক জায়গায় সম্পত্তি কিনেছেন। রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করেছেন। তার মধ্যে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামও রয়েছেন। যে বার্নহাম নিজে উন্নতি এবং বিনিয়োগের কথা বার বার বলছেন, তিনি কি সিটির পাশে থাকবেন, না কি সততার পক্ষ নেবেন?
সিটির ফুটবল যুগের কিছু কিংবদন্তিকেই বা ভুলে যাওয়া যায় কী করে? সিটির বোর্ডরুমের যারা ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের দোষের দায় কি নিতে হবে পেপ গুয়ার্দিয়োলাকে?
প্রিমিয়ার লিগে যুদ্ধ বাধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। শত্রু ক্লাবগুলি দাবি করতে পারে, সিটির জন্য তাদের লক্ষ লক্ষ ডলার ক্ষতিস্বীকার করতে হয়েছে। লিগে তিন বার ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড সিটির পিছনে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেছে। ২০১৫-১৬ মরসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইউনাইটেডকে টপকে সিটি খেলার সুযোগ পায়। ম্যাঞ্চেস্টার সিটির সাফল্যের কারণে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডকে কী ভাবে ক্ষতিস্বীকার করতে হয়েছে, তা নিয়ে সম্প্রতি একটি রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে।
টটেনহ্যাম হটস্পারকেও উদাহরণ হিসাবে টানা যেতে পারে। তারা নতুন স্টেডিয়াম তৈরির সময় অর্থখরচে রাশ টেনেছিল। ২০১১-২০১৫ সময়ের মধ্যে তিন বার তারা প্রিমিয়ার লিগে পঞ্চম স্থানে শেষ করেছিল, যেখানে সিটি শেষ করেছিল প্রথম চারের মধ্যে। সিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের যা অভিযোগ রয়েছে, তা ওই সময়কালের মধ্যেই।
যদি ওই তিন বার টটেনহ্যাম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলত, তা হলে তাদের লাভের পরিমাণ কতটা বেশি হতে পারত?
প্রতিটি ক্লাব এবং তাদের আইনি বিভাগকে এখন চোরাপথে হাঁটতে হবে। আগামী কয়েক বছর আদালতে প্রচুর বাদানুবাদ হতে চলেছে। অভিযোগ তুলতে পারে আর্সেনালও। সিটির অর্থের প্রস্তাব লুফে নিয়ে আর্সেনাল থেকে সামির নাসরি, গায়েল ক্লিশি, বাকারি সাগনা, কোলো তুরে, এমানুয়েল আদেবায়োরের মতো ফুটবলারেরা চলে গিয়েছেন। ওই ফুটবলারদের যে বেআইনি ভাবে কেনা হয়নি তার কী প্রমাণ রয়েছে?
আপাতত গোটা বিষয়টা নিয়েই ধোঁয়াশা রয়েছে। যা অবস্থা তাতে এখনই সব মিটবে না। আদালতে ঝগড়া, তথ্যচালাচালি, আইনজীবীদের গম্ভীর বৈঠক চলতেই থাকবে।