হোয়াট্সঅ্যাপেও বাড়ছে সাইবার প্রতারণার প্রবণতা। ভুয়ো অফার, পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় ভাঁড়িয়ে জালিয়াতি, ক্ষতিকর ফাইল এবং ভুয়ো বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের ফাঁদে ফেলছে সাইবার অপরাধীরা। অনেক সময় প্রতারণামূলক মেসেজগুলি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয় যে, আসল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঞ্চয় গায়েব করে দেওয়া, এ সবই ঘটছে। তাই, হোয়াট্সঅ্যাপে আসা যে কোনও সন্দেহজনক মেসেজ সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞেরা। হোয়াট্সঅ্যাপে পাতা প্রতারণার ফাঁদগুলি কী ভাবে এড়াবেন এবং কী কী সতর্কতা অবলম্বন করলে সুরক্ষিত থাকবে আপনার ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য, তারই সন্ধান দিল আনন্দবাজার ডট কম।
প্রতারকেরা অন্য ব্যক্তির নাম ও প্রোফাইল ছবি ব্যবহার করে ভুয়ো হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে পারে, যাতে তাদের পাঠানো মেসেজ আসল বলে ভ্রান্তি তৈরি হয়। এমনই একটি ঘটনায়, প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ নরেশ গুজরালের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা চালানোর অভিযোগ ওঠে। জানা যায়, প্রতারকেরা এক উচ্চপদস্থ আধিকারিককে পর্যন্ত একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে ৭.৮ কোটি টাকা পাঠাতে রাজি করিয়ে ফেলেছিল! তাই, প্রেরকের নাম ও প্রোফাইল ছবি পরিচিত হলেও, হোয়াট্সঅ্যাপে জরুরি ভিত্তিতে টাকা পাঠানোর অনুরোধ এলে সতর্ক থাকুন। এ ক্ষেত্রে টাকা পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি ফোন করে বা অন্য কোনও বিশ্বস্ত মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে নেওয়াই ভাল।
বস্ বা সিইও সেজে প্রতারণা। এই ধরনের প্রতারণায় সাইবার অপরাধীরা কোনও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিইও কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার আধিকারিকের ছদ্মবেশে কর্মীদের আর্থিক লেনদেন করতে প্ররোচিত করে। হোয়াট্সঅ্যাপ কিংবা ইমেলের মাধ্যমে জরুরি নির্দেশিকা অথবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত নথি বলে দাবি করা ক্ষতিকর ফাইলও পাঠাতে পারে প্রতারকেরা। এমনটাই জানিয়েছেন সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞেরা। কোনও কর্মীর ডিভাইস হ্যাক করতে পারলে প্রতারকেরা তাঁর হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নিতে পারে। এর পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে বেনামি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। তাই, প্রেরকের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে, কোনও সন্দেহজনক ফাইল বা অ্যাটাচমেন্ট না খোলাই ভাল।
ভুয়ো বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে প্রতারণা হোয়াট্সঅ্যাপে আরও একটি নতুন ফাঁদ। আকর্ষণীয় লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনলাইনে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের প্রকল্পে প্রলুব্ধ করতে পারে প্রতারকেরা। এমনকি, ভুয়ো বিনিয়োগ অ্যাপের লিঙ্ক পাঠানো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পটিকে আসল প্রমাণ করার জন্য কাল্পনিক মুনাফার গল্প ফাঁদা হয়। বিনিয়োগের পর টাকা তোলার চেষ্টা করা হলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। তাই, টাকা পাঠানোর আগে বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মগুলি যাচাই করে নেওয়া উচিত। অস্বাভাবিক বেশি লাভ করিয়ে দেওয়ার দাবিতেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।
ম্যালওয়্যার পাঠানোর উদ্দেশ্যে প্রতারকেরা হোয়াট্সঅ্যাপে এপিকে ফাইল অ্যাটাচমেন্ট হিসেবে বিবাহ বা যে কোনও অনুষ্ঠানের অছিলায় ভুয়ো আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে পারে। সেই ফাইল এক বার ডাউনলোড হয়ে গেলে, প্রতারকেরা তার সাহায্যেই হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত সমস্ত তথ্য নাগালে পেয়ে যায়। এমনকি, ওই মোবাইল ফোনের সমস্ত কার্যকলাপও নিরীক্ষণ করতে পারে সাইবার অপরাধীরা। এ ভাবেই হ্যাক হয়ে যাওয়া অ্যাকাউন্টগুলি ব্যবহার করে গ্রাহকের পরিচিতদের কাছেও জরুরি ভিত্তিতে টাকা পাঠানোর অনুরোধ জানাতে পারে প্রতারকেরা। তাই, অপরিচিত প্রেরকদের কাছ থেকে এই ধরনের ফাইল বা অ্যাটাচমেন্ট এলে, তা ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকুন এবং যিনি আমন্ত্রণপত্রটি পাঠিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, আগে সরাসরি তাঁর থেকে যাচাই করে নিন।
ঘোস্ট পেয়ারিং স্ক্যামে, প্রতারকেরা ব্যবহারকারীর অজান্তেই তাঁর হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট অন্য একটি ডিভাইসের সঙ্গে লিঙ্ক করতে প্ররোচিত করে। তারা বন্ধু বা কাস্টমার সাপোর্ট সিস্টেমের প্রতিনিধির পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীকে একটি কিউআর কোড স্ক্যান করতে বা একটি ভেরিফিকেশন কোড শেয়ার করতে বলতে পারে। ডিভাইসটি লিঙ্ক হয়ে গেলে, প্রতারক সহজেই ব্যবহারকারীর চ্যাট এবং শেয়ার করা মিডিয়া কন্টেন্টগুলি অ্যাক্সেস করতে সক্ষম হয়ে যেতে পারে। তাই, কখনও ভেরিফিকেশন কোড শেয়ার করবেন না বা সন্দেহজনক কিউআর কোড স্ক্যান করবেন না এবং আপনার অ্যাকাউন্টের সঙ্গে লিঙ্ক করা ডিভাইসগুলি নিয়মিত লগ আউট করাই নিরাপদ।