Advertisement
E-Paper

অসুখে শয্যাশায়ী স্ত্রী আর হাসেন না, টোল পড়া গালের সুখস্মৃতি থেকে হাসিমুখের মূর্তি গড়লেন মধ্যমগ্রামের ৮৮ বছরের শিক্ষক

মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা ভূপতিরঞ্জন দেবনান দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা করেছেন। সেই সঙ্গে যত্নে লালন করেছেন শখ— নানা রকমের মূর্তি বানানো। বিভিন্ন শিল্পকর্মের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল শিল্পকর্মটি অর্ধাঙ্গিনীর মূর্তি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৭
(বাঁ দিকে) ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ। তাঁর গড়া স্ত্রী অঞ্জলি দেবনাথের মূর্তি। (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ। তাঁর গড়া স্ত্রী অঞ্জলি দেবনাথের মূর্তি। (ডান দিকে)।

স্ত্রী হাসলে তাঁর ঠোঁটের দু’পাশে ছোট্ট দুটো টোল ফুটে উঠত। প্রায় ৬০ বছরের বছরের দাম্পত্য, সংসার সামলানো, সন্তানদের বড় করা, হাজারও ওঠাপড়ার মধ্যে অঞ্জলির ওই হাসিটুকু আজও অমলিন ভূপতিরঞ্জনের মনে। কিন্তু সত্তর পার করা অঞ্জলির মুখে আর হাসি নেই। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি রোগশয্যায়। স্ত্রীর স্মিত মুখকে অমরত্ব দিতে তাঁর হাসিমাখা মুখের মূর্তি তৈরি করলেন ৮৮ বছরের বৃদ্ধ।

উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ। দীর্ঘ দিন মধ্যমগ্রাম হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি যত্নের সঙ্গে লালন করেছেন শখ— নানা রকমের মূর্তি বানানো। বাড়ি জুড়ে বিভিন্ন শিল্পকর্ম রয়েছে। সেখানে সবচেয়ে উজ্জ্বল শিল্পকর্মটি অর্ধাঙ্গিনী অঞ্জলি দেবনাথের মূর্তি। ৮৮ বছর বয়সে এসে স্ত্রীর মূর্তি বানানো ভূপতি জানালেন, রোগশয্যায় থাকা স্ত্রীকে এ ভাবে দেখতে তাঁর ভাল লাগে না। বার্ধক্যজনিত সমস্যায় দীর্ঘ দিন ধরে অঞ্জলি শয্যাশায়ী। সেই চেনা হাসি যেন সময় কেড়ে নিয়েছে। তিনি সেই হাসিটুকু ধরে রাখতে চান।

শিক্ষকতার পাশাপাশি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিভৃতে শিল্পচর্চা করছেন ভূপতিরঞ্জন। মাটি, নারকেল, গাছের ডাল-সহ গৃহস্থালির বিভিন্ন সাধারণ উপকরণ দিয়ে অসংখ্য মডেল বানিয়েছেন। বাড়ির শোকেসে সাজানো রয়েছে সেই সমস্ত শিল্পকর্ম। ক্যানভাসেও প্রতিভার ছাপ স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান, উস্তাদ আলাউদ্দিন খান, মান্না দে-র মতো বিশিষ্টদের ছবি এঁকেছেন প্রবীণ শিক্ষক। তাঁর শিল্পকর্ম বিভিন্ন প্রদর্শনীতেও গিয়েছে। তবে এ বারের শিল্পকর্ম একান্ত ব্যক্তিগত।

যৌবনে দেবনাথ দম্পতি।— নিজস্ব চিত্র।

যৌবনে দেবনাথ দম্পতি।— নিজস্ব চিত্র।

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ জীবনে নানা ব্যক্তিগত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন ভূপতিরঞ্জন। করোনার সময় পুত্রকে হারিয়েছেন। পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি তাঁর কাছেই থাকেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সমস্ত কিছুর মধ্যে দেবনাথ দম্পতির মিল দেখার মতো। কিন্তু সেই স্ত্রী যখন শয্যাশায়ী হলেন, একাকিত্ব যেন গ্রাস করেছিল বৃদ্ধকে। ‘‘আসলে তখনই তো মানুষ শিল্পের দিকে ঝোঁকেন’’, বলছিলেন এক প্রতিবেশী।

ভূপতিরঞ্জন অবশ্য এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে চান না। তাঁর কথায় বার বার ফিরে এল অঞ্জলির কথা। অশীতিপর মাস্টারমশাই জানান, ব্যাঙ্ক থেকে জমানো টাকা তুলতেও সমস্যায় পড়ছেন আজকাল। কারণ, বেশিরভাগই যৌথ অ্যাকাউন্ট। স্ত্রী রোগে শয্যাশায়ী থাকায় তাঁর সইটুকু নেওয়াও অসুবিধার হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ত্রীকে ওই ভাবে দেখতেই তাঁর কষ্ট হয়। কথা বলতে বলতে বারবার চোখে জল চলে আসে প্রবীণের।

পেনশনের টাকায় কোনও রকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। নুয়ে পড়েছেন বয়সের ভারে। তবে শিল্প এবং স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালবাসা অটুট। নিজের বানানো অঞ্জলির হাসিমুখের মূর্তিটি দেখে স্মিত হাসেন ভূপতিরঞ্জন।

madhyamgram Sculpture Love Story Couple

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy