দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর ও সংলগ্ন এলাকায় ফলের বাগানে মরণফাঁদ নাইলনের জাল! লিচু, পেয়ারা এবং অন্যান্য ফল রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গাছে গাছে নাইলনের সূক্ষ্ম ‘ফাঁদি’ জাল ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি-সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বন দফতরকে অভিযোগ জানিয়েছে একটি বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন। আর তারই জেরে তৎপর হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা বনবিভাগ।
মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রজাতির পাখি ও ফলাহারী বাদুড়দের হাত থেকে ফল বাঁচাতে এই জাল লাগানো হলেও, তাতে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে অন্যান্য বৃক্ষবাসী বন্যপ্রাণীরাও। অভিযোগ, ফলের মরসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও শ্রমিকের অভাব ও অতিরিক্ত খরচের দোহাই দিয়ে বহু বাগানে এই জাল মাসের পর মাস গাছেই রেখে দেওয়া হয়। ফলে মৃত্যুমিছিল চলতেই থাকে। শহরের বনপ্রাণপ্রেমী সংগঠন ‘হিউম্যান অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্স লিগ’ (হিল)-এর একটি প্রতিনিধিদল অগস্ট মাসে বারুইপুর ও সংলগ্ন কল্যাণপুর, ফুলতলা, কৃষ্ণমোহন হল্ট, শিখরবালি, শাসন এবং গোবিন্দপুর-সহ ২৬টি এলাকায় পর্যবেক্ষণ চালায়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তাদের অনুমান, এই অঞ্চলে প্রায় ২,০০০ থেকে ৫,০০০ গাছে এই জাল লাগানো হয় এবং বেশির ভাগ গাছেই সারা বছর ধরে এই মরণফাঁদ ঝুলে থাকে।
মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রজাতির পাখি ও ফলাহারী বাদুড়দের হাত থেকে ফল বাঁচাতে জাল লাগানো হলেও, তাতে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে অন্যান্য বৃক্ষবাসী বন্যপ্রাণীরাও। — নিজস্ব চিত্র।
হিল-এর পক্ষ থেকে এই বিষয়টি রাজ্য বন দফতর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা বনবিভাগের নজরে আনা হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বন দফতর ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের কর্ণধার শুভ্রজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়। এ বিষয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভাগীয় বনাধিকারিক (ডিএফও) নিশা গোস্বামী বলেন, ‘‘ফলের মরসুম চলে যাওয়ার পরেও গাছে সারা বছর ধরে জাল ঝুলে থাকায় পাখি ও বন্যপ্রাণীদের মৃত্যু বাড়ছে। এমনটা চলতে পারে না। অভিযোগ পেয়েই আমাদের রেঞ্জ অফিসার, বিট অফিসার ও বনকর্মীরা ঘটনাস্থলগুলি ঘুরে ঘুরে ফলচাষিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের সহযোগিতায় গত এক সপ্তাহ ধরে জাল সরানোর কাজ চলছে।’’
আরও পড়ুন:
হিল-এর ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর শান্তনু দাস জানান, বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণের সময় মাছরাঙা, হরিয়াল, খুরুলে পেঁচা (স্পটেড আউলেট), বেনেবৌ, টুনটুনি, চাতক-সহ নানা স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির পাশাপাশি কাঠবিড়ালী এবং বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়ের দেহ ঝুলতে দেখেছেন তাঁরা। আধমরা অবস্থায় উদ্ধার করেছেন জালে ঝুলতে থাকা সোনালি-পিঠ কাঠঠোকরা, ছিট ঘুঘু এমনকি, একটি ভামকে (এশিয়ান পাম সিভেট)! তাঁর কথায়, ‘‘এই বিশাল সমস্যার এটি একটি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র। এর আগেও এই এলাকায় ভাম, বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড় এবং ওই এসাকায় বিরল ভুতুম পেঁচা-সহ নানা পাখির জালে আটকে মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি আমরা। যে সব পাখির ফল খাওয়ার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই, তারাও ওই জালে আটকে মারা যাচ্ছে। এমনকি, পুরনো বা ছেঁড়া জাল মাটিতে পড়ে থাকার ফলে তা সাপ ও অন্যান্য সরীসৃপদের জন্যও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।’’ তবে বন দফতরের সক্রিয়তায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানান তিনি।