‘মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজের জন্য আমাদের ছোট্ট প্রচেষ্টা’। এই মন্ত্র নিয়েই এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানার বাদাবনে ঘেরা ভাঙন কবলিত ঈশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দাদের আপদ-বিপদের সঙ্গী ‘স্বামী বিবেকানন্দ সেবাব্রত ফাউন্ডেশন’ আর তার কর্ণধার সোমনাথ ভুঁইয়া। যাঁর কর্মকাণ্ড দেখলে মনে পড়ে যাবে আশুতোষ গোয়ারিকরের চলচ্চিত্র ‘স্বদেশ’-এ শাহরুখ খান অভিনীত মোহন ভার্গব চরিত্রটির কথা।
কোচবিহার গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি-টেক ডিগ্রিধারী সোমনাথ অবশ্য মোহনের মতো পরবাসী নন, কর্মসূত্রে কলকাতার বাসিন্দা। তাই সুযোগ পেলেই চলে আসতে পারেন তাঁর শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত গ্রামে। সেই পরিসরটুকুর সদ্ব্যবহার করে, হাতানিয়া-দোয়ানিয়া ও সপ্তমুখীর প্লাবনে এবং বাদাবন কেড়ে মেছোভেড়ি বানানোর সিন্ডিকেটের ‘সৌজন্যে’ ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসা ঈশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দাদের সাহায্যের জন্য বছর ভরই সক্রিয় তিনি। আর এ ক্ষেত্রে সোমনাথের সঙ্গী সমমনস্ক কিছু বন্ধু ও গ্রামবাসী। কখনও বাদাবন রক্ষায় সচেতনতা শিবির, কখনও প্রান্তিক পরিবারের পড়ুয়াদের মধ্যে বই-খাতা-শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ, পুজোর আগে নতুন পোশাক বিলি কখনও বা গ্রামের অসুস্থদের কলকাতায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ‘স্বামী বিবেকানন্দ সেবাব্রত ফাউন্ডেশন’। গ্রামের শিশুদের জন্য তারা গড়ছে বিনামূল্যের পাঠশালা। কাজের ফাঁকে সেখানে ৫০টিরও বেশি শিশুকে পড়াশোনায় সাহায্য করেন ফাউন্ডেশনের সদস্যেরা। এ বার শীত পড়ার আগেই গ্রামের গরিব পরিবারগুলিতে কম্বল বিতরণ কর্মসূচি শুরু হয়ে গিয়েছে ঈশ্বরীপুরে।
সোমনাথের কথায়, ‘‘আমি এই গ্রামে বড় হয়ে উঠেছি। গ্রামের মানুষের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং নানা প্রতিকূলতা খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মনে হয়েছে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করা বিশেষত প্রান্তিক পরিবারগুলির শিশুদের পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব। আমার কাছে জীবনের সার্থকতা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’’ তিনি জানান, ২০২১ সালের মে মাসে ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ের সময় থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের বেলুড় মঠের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুন্দরবন এলাকার বিভিন্ন গ্রামে নানা সেবামূলক ও মানবকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই মনে চাগাড় দিয়েছিল নিজের এলাকার বাসিন্দাদের জন্য কিছু করার তাগিদ। ঘূর্ণঝড় পরবর্তী পর্যায়ে নিজেদের উদ্যোগে তিন মাস ধরে কমিউনিটি কিচেন চালিয়েছিলেন তাঁরা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির কাছে নিয়মিত খাবার পৌঁছে দিতে সে সময় প্রায় ৩৫টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাঁদের সাহায্য করেছিল বলে জানান সোমনাথ।
নামখানা স্টেশন থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে অবস্থিত হলেও ইশ্বরীপুরে আজও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত। গ্রামের প্রায় সব রাস্তাই মাটির। প্রতি বছর বন্যা ও নদীবাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে রাস্তার প্রচণ্ড ক্ষতি হয়। এমনকি, অনেক জায়গায় চলাচলের পথই পরিবর্তিত হয়ে যায়। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার সোমনাথ বলেন, ‘‘আমাদের এলাকার নদীবাঁধই মূলত যাতায়াতের প্রধান রাস্তা। কিন্তু সেই বাঁধের রাস্তা মাটির এবং অত্যন্ত ভগ্নদশায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতি যে, অনেক জায়গায় সাইকেল নিয়েও ঠিকমতো চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে ও বন্যার সময় এই দুরবস্থা আরও বেড়ে যায়। এর ফলে গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া, অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া এবং জরুরি পরিষেবা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।’’ তিনি জানিয়েছেন, রাজ্যের নতুন সরকার আসার পরে পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির কাছে দরবার করেছে ‘স্বামী বিবেকানন্দ সেবাব্রত ফাউন্ডেশন’। শুধু সুন্দরবনের মানুষ নয়, বাদাবন ও তার বন্যপ্রাণ রক্ষার দিকটিতেও ধীরে ধীরে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে তারা। সম্প্রতি ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে মাছের ভেড়ি বানানোর প্রবণতার বিরুদ্ধে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষা নিয়ে সচেতনামূলক প্রচার অভিযানও শুরু করা হয়েছে সংগঠনের তরফে।