আর পাঁচটা বনেদি বাড়ির তুলনায় ক্যানিংয়ের ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গা পুজোর বিশেষত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, এখানে দেবী পূজিতা হন পোড়া মুখ নিয়ে। মা দুর্গার সারা শরীরও ঝলসানো তাম্রবর্ণের। এ ছাড়াও, এখানে দেবী দুর্গার ডানদিকের পরিবর্তে বাঁদিকে থাকেন গণেশ।
পূর্ববঙ্গের ঢাকার বিক্রমপুর বাইনখাঁড়া গ্রামে ৪৪৪ বছর আগে শুরু হয়েছিল এই পুজো। বাংলাদেশ থেকে এদেশে ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যেরা এদেশে চলে আসায় ক্যানিংয়ের দীঘিরপাড় গ্রামে শুরু হয় পুজো। পুজোর জৌলুস কমলেও, এখনও বনেদিয়ানায় ঘাটতি পড়েনি ভট্টাচার্জ বাড়ির পুজোয়। সমস্ত নিয়ম নিষ্ঠা মেনে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে আজও। শহরতলির থিমের পুজোকে টেক্কা দিয়ে প্রতিদিন রীতিমতো দর্শকদের ভিড় জমে পোড়ামুখী দুর্গা দর্শনের জন্য।
বাংলাদেশে এই ভট্টাচার্যদের বংশধরেরা শুরু করেছিলেন মা দুর্গার পূজা। মূলত জমিদার বাড়ির শোভা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য শুরু হয়েছিল দেবী দুর্গার আরাধনা। আর পাঁচটা জমিদার বাড়ির মতই সাবেক মতে পুজো শুরু হয়েছিল সেখানে। পাঁঠা বলি, মহিষ বলিও হত। কিন্তু পূজা শুরুর প্রায় শতাধিক বছর পরে এই ভট্টাচার্য বাড়িতে ঘটে দুর্ঘটনা। আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় দুর্গা দালান। পুড়ে যায় মাতৃ মূর্তি। পুজো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। কিন্তু কথিত আছে, স্বপ্নে দেবী পোড়া মুখেই পুজো চান, সেই থেকেই এই পোড়া মুখেই মা দুর্গা পূজিত হন ভট্টাচার্য পরিবারে।
পরিবারের সদস্যদের কথায়, বাড়িতে দেবী দুর্গার মন্দিরের পাশে ছিল দেবী মনসার মন্দির। পুরোহিত মনসা পূজো করে দুর্গা পুজো করতে এলে একটি কাক মনসা মন্দিরের ঘি-য়ের প্রদীপের পলতে নিয়ে উড়ে যাওয়ার সময়ে দুর্গা মন্দিরের শনের চালে সেটি পড়ে যায়। আর তাতেই পুড়ে যায় দুর্গা মন্দির ও প্রতিমা। এরপরে এই বাড়ির মানুষজন ভাবেন দেবী দুর্গা বোধহয় তাঁদের পুজো আর চাইছেন না। সেই মোতাবেক পুজো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। এমন অবস্থায় একদিন রাতে স্বপ্নাদেশ পান এই পরিবারের তৎকালীন গৃহকর্তা রামকান্ত ভট্টাচার্য। দেবী দুর্গা স্বপ্নাদেশ দেন যে তাঁর পুজো যেন কোন ভাবেই বন্ধ না হয়, তাঁর ওই পোড়া রূপেই যেন তাঁকে পুজো করা হয়। এমন স্বপ্ন পাওয়ার পর থেকে আজও দেবীর সেই পোড়া মুখ ও ঝলসানো শরীর এর মূর্তিতেই বছরের পর বছর চলে আসছে ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজো।
এছাড়াও এই বাড়ির দুর্গা প্রতিমার আরও একটি বিশেষত্ব রয়েছে। এখানে গণেশ দেবীর ডান পাশের পরিবর্তে বাম পাশে থাকেন। পরিবারের সদস্য পীযূষ ভট্টাচার্য বলেন, “পুরাণে কথিত আছে, গণেশ বড় না কার্তিক বড়, এ নিয়ে মা দুর্গার দুই সন্তানের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছিল। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে যিনি আগে ঘুরে আসতে পারবেন, তিনিই বড় বলে বিবেচিত হবেন বলে ঠিক হয়। কার্তিক নিজের বাহন ময়ূরের পিঠে চেপে রওনা দেন। গণেশ নিজের মাকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মনে করে তাঁকে প্রদক্ষিণ করে মায়ের বাঁ দিকে স্থান নেন। আমরাও সে কারণে আমাদের পুজোয় গণেশ ও কার্তিকের জায়গা অদল-বদল করেছি। বছরের পর বছর এই রীতি মেনেই পুজো হয়।”
আগে মহিষ বলি হলেও বর্তমানে ফল বলি হয়। জন্মাষ্টমী তিথিতে কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে এই বাড়ির দুর্গা পুজোর শুরু। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একই কাঠামোয় পুজো চলছে ভট্টাচার্য বাড়িতে। শুধু ক্যানিং নয়, আশপাশের এলাকা-সহ দূর-দূরান্ত থেকেও এই বাড়ির প্রতিমা দর্শন করতে বহু মানুষ আসেন।
পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্য পল্লবী ভট্টাচার্য বলেন, “পুজোর ক’টাদিন বাড়িতেই আনন্দ করে কেটে যায়। মণ্ডপের কাজ, পুজোর জোগাড়ে হাত লাগাই। কী ভাবে যে চারটে দিন কেটে যায়, বুঝতেই পারি না। দশমীতে মায়ের বিসর্জনের পরেই বাইরের ঠাকুর দেখতে যাওয়া হয়।”