বাড়ির উঠোনে বসেছিলেন দুর্গামণি মাঝি, বয়স আশি পেরিয়েছে। বার্ধক্য আর অসুস্থতায় শরীর ভেঙে পড়েছে। বাড়িতে এত আত্মীয়-স্বজনের হঠাৎ যাতায়াত কেন, তা নিয়ে বৃদ্ধা প্রশ্ন করছেন থেকে থেকে। জানতে চাইছেন, ছেলেরা ভাল আছে তো? কিন্তু সকলেই এড়িয়ে যাচ্ছেন উত্তর। এখনও খোঁজ নেই দুর্গামণির তিন ছেলে জয়রাম মাঝি, রবীন্দ্র মাঝি এবং জগন্নাথ মাঝির। এঁদের বাড়ি ওড়িশার বালেশ্বর জেলার উলুদা গ্রামে। সকলেই ছিলেন ডুবে যাওয়া ‘এফবি জয় মা কালী’ ট্রলারে। যে ন’জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে সোমবার পর্যন্ত, তিন ভাই তাঁদের মধ্যে আছেন, নাকি এখনও নিখোঁজ ছ’জনের তালিকায় আছেন তাঁরা—উত্তর নেই কারও কাছে।
বছর পনেরো আগে মারা যান দুর্গামণির স্বামী, তিনিও ছিলেন মৎস্যজীবী। তাঁর মৃত্যুর পরে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিন ছেলে। তিন জনের আলাদা সংসার, এক মাস অন্তর অন্তর তিন ছেলের থাকেন তাঁদের মা।
বড় ভাই জয়রামের স্ত্রী লিপু মাঝি বলেন, ‘‘ট্রলারে ওঠার পরে কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছিল। বলেছিলেন, ইলিশ নিয়ে ফিরবেন। সেই আশাতেই অপেক্ষা করছিলাম। এখন কী অবস্থা, কিছুই বুঝতচে পারছি না।’’
মেজো ভাই রবীন্দ্রের সংসারে স্ত্রী অম্বিকা এবং দুই নাবালিকা মেয়ে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম রবীন্দ্রই। চোখের জল সামলে অম্বিকা বলেন, ‘‘ছোট মেয়েকে কথা দিয়েছিলেন, রথের মেলায় নিয়ে যাবেন। মেয়েটা এখনও বাবার অপেক্ষায়!’’
ছোট ভাই জগন্নাথের স্ত্রী সীতারানির কথায়, ‘‘তিন ভাই সব সময়ে এক সঙ্গে সমুদ্রে যেতেন। কেউ ভাবেনি, এমন দিন দেখতে হবে। আমার নাবালক দুই ছেলেমেয়ে। জানি না, সামনে কী অপেক্ষা করে আছে।’’
সোমবার ভোরে পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগর এবং মন্দারমণি উপকূল থানার পুলিশের ব্যবস্থাপনায় গাড়ি করে নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের পরিবারের সদস্যদের আনা হয় কাকদ্বীপে। মন্দারমণি উপকূল থানার পুলিশ সূত্রের খবর, নিখোঁজ ১৫ জন মৎস্যজীবীর মধ্যে আটজন রামনগর বিধানসভা এলাকার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। একজন পটাশপুরের মল্লিকপাড়ার বাসিন্দা। দু’জন নদিয়া এবং একজন হাওড়ার। তিনজন ওড়িশার বালেশ্বরের। রামনগরের নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের পরিবারের সঙ্গে একই গাড়িতে কাকদ্বীপ এসেছেন ওড়িশার ভোগরাইয়ের বাসিন্দা সন্ন্যাসী মাজি। তিনি বলেন, ‘‘দুই ভাইয়ের সঙ্গে আমার এক আত্মীয় জয় মা কালী ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়েছিল। দুর্ঘটনায় এতগুলো দেহ পাওয়া গিয়েছে শুনে কাকদ্বীপে এসেছি। কিন্তু দেহ দেখে কাউকেই চিনতে পারছি না।’’
সকালে কাকদ্বীপে আসেন রামনগরের বিধায়ক চন্দ্রশেখর মণ্ডল।