দু’জনে ছিল একে অপরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। হাসি-রাগ-অভিমান-ঝগড়া-আপসে কথা বন্ধ হত না। পুজো হোক বা পার্বণ, একসঙ্গে হাজির হত দু’জনেই। সপ্তমীর দিনও সল্টলেকে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল তানিয়া বিশ্বাস আর বর্ণালী হালদার। দু’জনেরই বয়স ১৭। চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছে দুই বন্ধুই। নিউ টাউনের গৌরাঙ্গনগরে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দুর্গাপুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হয়েছে শোকের আবহে।
তানিয়া ও বর্ণালীর বাড়ি নিউ টাউনের গৌরাঙ্গনগর এলাকার নতুনপল্লির সুভাষ সরণিতে। দু’জনেই একাদশ শ্রেণিতে পড়ত। পুজোয় ঠাকুর দেখার পরিকল্পনা বহু দিন আগেই সেরে রেখেছিল দুই বান্ধবী। তাদের নিয়ে দলে ছিলেন মোট সাত জন। শনিবার সন্ধ্যায় গিয়েছিল চোরবাগানে। দুই বান্ধবী আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, শাড়ি পরবে। সেইমতো সেজেগুজে পৌঁছে গিয়েছিল কলকাতায় ঠাকুর দেখতে। শনিবার সন্ধ্যায় চোরবাগানে গিয়েই বিপত্তি। পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ যায় বর্ণালী এবং তানিয়ার।
ঘটনার পর থেকেই তানিয়ার পরিবার শোকে পাথর হয়ে গিয়েছে। কথা বলতে পারেনি তারা। বর্ণালীর বাবা পেশায় রিকশাচালক। মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। এখন হাসপাতালে মেয়ের দেহের ময়না তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন। বাড়িতে মা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, মেয়ে ও তার বান্ধবীর এমন পরিণতির কথা। মৃত্যুতেও একে অপরের হাত ছাড়েনি দুই প্রিয় বান্ধবী।
চোরবাগানের বিপর্যয়ে প্রাণ গিয়েছে ১৯ জনের। রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রবিবার সকালে সাত জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির কয়েক জন কর্তাও। ভিআইপি পাস সামলানো এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাঁদের উপরে ছিল, তাঁদেরও পাকড়াও করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার দুই কর্মীও।
আরও পড়ুন:
পুজো কমিটির যে পোস্টার প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা যায় চোরবাগানের এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দেবদীপ অধিকারী। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো। জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা এই পুজো কমিটির চেয়ারম্যান। উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষও জড়িত রয়েছেন চোরবাগানের এই পুজোর সঙ্গে। তবে তাঁদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না, পুলিশের তরফে এখনও কিছু জানানো হয়নি। সেই নিয়ে ইতিমধ্যে সরব হয়েছে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আঙুল তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপোর দিকে। এই আবহে বিজেপি বিধায়ক রত্নাও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে হুগলির বৈদ্যবাটীর বাসিন্দা শ্রীপর্ণা পোদ্দার। তাঁর বয়স ২৭ বছর। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান শ্রীপর্ণা টাটা ক্যানসার হাসপাতালের নার্স। শনিবার সকালে কাজে বের হয়েছিলেন। সেখান থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন চোরবাগানে। মৃতার বান্ধবীর থেকে খবর পেয়ে পরিবারের লোক ও স্থানীয়েরা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের উদ্দেশে রওনা হন।
প্রতিবেশী হরিদাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘খুব প্রাণবন্ত মেয়ে ছিল। পাড়ায় কেউ অসুস্থ হলে সবচেয়ে আগে ও এগিয়ে আসত। এই খবরে বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছি।’’