পুজোর মধ্যেই প্রকাশ্য রাস্তায় মানসিক ভারসাম্যহীন, ভবঘুরে এক মহিলা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনায়। অভিযোগ, তাঁর আর্তনাদ শুনেও তাঁকে উদ্ধার করতে আর এক জন মহিলা ছাড়া এগিয়ে আসেননি কেউ। এমনকি তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখেও তাঁর লজ্জা নিবারণের কোনও রকম চেষ্টা করতে দেখা যায়নি অন্য কাউকে। নির্যাতিতার সাহায্যে এগিয়ে আসা অন্য মহিলাই পুজোর একটি বিজ্ঞাপনের ব্যানার দিয়ে প্রাথমিক ভাবে নির্যাতিতার শরীর ঢেকে দেন।
সপ্তমীর রাতে এমনই এক অমানবিক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল উত্তর ২৪ পরগনার ওই এলাকা। খানিক পরে অবশ্য কয়েক জন যুবক এগিয়ে এসে অভিযুক্তকে ধরে ফেলেন এবং পুলিশের হাতে তুলে দেন বলে সাহায্যকারিণীর দাবি।
পুলিশ সূত্রের খবর, ওই ঘটনায় সুভাষ মণ্ডল নামে এক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নির্যাতিতাকেও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে খুঁজে বার করার চেষ্টা চলছে। গোটা ঘটনাটি সামনে আসে বারাসতের বাসিন্দা মধুমিতা দেব রায়ের সমাজমাধ্যমে লেখা পোস্ট থেকে। মধুমিতা জানান, তিনি তাঁর স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে সপ্তমীর রাতে মধ্যমগ্রাম থেকে ঠাকুর দেখে বাড়ি ফিরছিলেন স্কুটিতে চেপে। রাত তখন প্রায় সওয়া একটা। স্কুটিতে যেতে যেতেই তিনি দেখতে পান, রাস্তার ধারে একটি আবাসনের নীচে এক বিবস্ত্র মহিলাকে নির্যাতন করছে এক ব্যক্তি। মধুমিতার কথায়, ‘‘আমি শুরুতে বুঝতে পারিনি। মহিলাকে চিৎকার করতে দেখেছিলাম। আমরা তখন স্কুটারে। খানিকটা পথ এগিয়ে চলেও যাই। তার পরে সন্দেহ হওয়ায় ফের স্বামীকে নিয়ে ফিরে আসি ঘটনাস্থলে। দেখি, মানসিক ভারসাম্যহীন ওই মহিলা চিৎকার করছেন। আর লোকটি তাঁকে ধর্ষণ করছে। আমি চিৎকার করে লোক জড়ো করার চেষ্টা করি। রাস্তায় লোকজন ছিল না এমন নয়। কিন্তু কেউ সে ভাবে এগিয়ে আসেননি।’’
মধুমিতার দাবি, তিনি সাহায্য চাওয়া সত্ত্বেও বেশির ভাগই নির্বিকার ভাবে চলে যাচ্ছিলেন। ‘‘আমি চিৎকার করে বলছি যে, মহিলাকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। কিন্তু সবাই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন। আমিও ভয় পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, লোকটি যদি আমাকে আক্রমণ করে। তার পর অবশ্য কয়েক জন যুবক আশপাশ থেকে ছুটে আসেন।’’ মধুমিতার অভিযোগ, ‘‘যে আবাসনের নীচে এই ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার নিরাপত্তা-কর্মীও মহিলাকে উদ্ধারের কোনও চেষ্টা করেননি। মহিলার গায়ে ঢাকা দেব বলে একটু কাপড় চেয়েছিলাম। তা-ও তিনি দিতে পারেননি। শেষে এক ব্যক্তি আমাকে একটি পুজোর বিজ্ঞাপনের ব্যানার এনে দেন। আমি সেটি দিয়ে মহিলার শরীরে ঢাকা দিই।’’
ইতিমধ্যে আশপাশের যুবকেরা এসে উপস্থিত হওয়ায় সুভাষ নামে ওই দুষ্কৃতী পালানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু যুবকেরা তাকে ধরে ফেলেন। ফোন করা হয় পুলিশকে। দুষ্কৃতীকে ধরে সকলে মিলে টানতে টানতে সরিয়ে নিয়ে যান। তার পর পুলিশ এসে তাকে গ্রেফতার করে বলে জানিয়েছেন মধুমিতা। তার পর ওই আবাসনের নীচে ফিরে গিয়ে নির্যাতিতা মহিলাকে আর দেখতে পাওয়া যায়নি। সূত্রের খবর, তিরিশের কোঠায় বয়স ওই ভবঘুরে মহিলার। তিনি ওই তল্লাটেই ঘোরাফেরা করেন। মাঝেমধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচিও করেন। যে কারণে ওই রাতে যখন মহিলা চিৎকার করছিলেন, তখন স্থানীয় লোকজন তাতে অস্বাভাবিক কিছুর আঁচ পাননি। কেউ সেই চিৎকারে প্রথমে বিশেষ গুরুত্বও দেননি।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দিয়েছে, দু’দশকেরও বেশি সময় আগে রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা। যেখানে এক গৃহবধূকে নিগ্রহ করা হয়েছিল প্রকাশ্যে। সাংবাদিক অনন্যা চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আর কেউ ওই বধূকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেননি। পরবর্তী কালে সুচিত্রা ভট্টাচার্য সেই ঘটনা অবলম্বমে একটি উপন্যাস লেখেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ ছবিও তৈরি করেন।
মধুমিতা বলেন, ‘‘পুলিশ আমার বাড়িতে এসে কথা বলেছে। পুলিশ জানিয়েছে, মহিলাকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রয়োজন হলে আমিও লিখিত অভিযোগ জমা দেব। তবে যেটা খুব খারাপ লাগল, তা হল, অধিকাংশ মানুষেরই এতটুকু সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই।’’