E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

তাঁর হাতেই প্রাণ পায় নুন-মরিচের মেয়ে জীবন

ঢালাই রাস্তাটা একেবারে গ্রামের ভিতর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। ধারে বাঁধা হচ্ছে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল। বাড়ির দাওয়ায় বসে গল্পে মশগুল কয়েক জন মহিলা।

অরিতা ধারা ভট্ট

শেষ আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৩৭
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের সঙ্গে ছবিতা।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের সঙ্গে ছবিতা। ছবি: শুভ্র মিত্র।

আশ্বিনেও শান্তি নেই। দুপুর গড়াতে চলল, হঠাৎই কালো আকাশ!

‘ও কাকিমা, বৃষ্টি এল গো!’ শাড়িটা কোমরে আরও কষে নিয়ে ছুটলেন ছাদে। তিন তলার ছাদ জুড়ে শরতের রোদ খাচ্ছিল সর্ষেরা। একা হাতেই বস্তা, গামলা নিয়ে সাপটে সবটা। দু’ফোটা জলও পড়তে দেওয়া যাবে না সাধের ফসলে। দ্রুত পায়ে নীচে এসে আবার ঢেঁকিঘরে। আবার যন্ত্র ঢেঁকিতে ধান ভাঙা।

রাস্তার দু’ধারে ধান খেত। মাঝে কিছু মাঠে গাঁদার চাষ হচ্ছে। সেখান থেকে ১০০ মিটার দূরেই দামোদর। অজস্র কাশফুলের মাঝে সোনালি মিহি বালির গাদা। ছেলেছোকরারা খেলছে হইহই করে। মেঘ কেটে গিয়ে আবার আশ্বিনের রোদ ছড়িয়ে পড়েছে তাদের গায়ে। বাড়িগুলোর ছাদেই ভাল শাড়ি, জামা রোদে দেওয়া।

এ সবই ওঁর নুন-মরিচের জীবন।

ঢালাই রাস্তাটা একেবারে গ্রামের ভিতর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। ধারে বাঁধা হচ্ছে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল। বাড়ির দাওয়ায় বসে গল্পে মশগুল কয়েক জন মহিলা। সেখানেও সেই সর্ষে দানা জীবনের হিসেবনিকেশ: ‘‘হলুদ আর সর্ষেটা ভাল করে করব। বাদামের বীজগুলো তুলে রাখিস। আলু উঠলেই দিতে হবে। দিদি বলেছে...।’’

দিদির বাড়ি এই মহল্লাতেই। তিনি মেঘ দেখেই ছাদে গিয়েছিলেন সর্ষে তুলে আনতে। ফিরে ঢেঁকির কাজ দেখে এসে বসলেন। তার পরে বাইরের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বললেন, ‘‘এই জীবনটা আমার একারনয়। আমাদের।’’

পঁচিশ বছর আগে তেমন ছিল না যদিও। তিনি তখন সবে একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী শুরু করেছেন। ভাবনাটা ছিল, তার ছাতার তলায় নিয়ে আসবেন মেয়েদের। যা ধীরে ধীরে পঞ্চায়েত সঙ্ঘ হয়ে উঠবে। সে জায়গাটা বাঁকুড়ার সোনামুখী ব্লকের ডিহিপাড়া গ্রাম। অনেক বড় কাজ, জেনেও ছবিতা প্রামাণিক নেমে পড়েছিলেনকোমর কষেই।

কী সামলাতে হয়নি তখন! ‘‘পাশে দাঁড়ানোর লোক তখন কোথায়?’’

বাড়ির মেয়ে বাইরে কাজ করবে, ঋণ নেবে— এ সব শুনে বাড়ি এসে কথা শুনিয়ে যেতেন গ্রামের মাতব্বরেরা। প্রায় একঘরে করে রাখা হয়েছিল। কারও বাড়িতে কথা বলতে গেলে মুখের উপর দরজা বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু মহাজনদের শতকরা ৫ টাকা সুদের চক্র থেকে বেরনোর পণ করেছিলেন যে ছবিতা।

‘‘শেষে অবশ্য সেই আগল ভাঙল। শতকরা পাঁচ টাকা সুদ বড় কম কথা নয়। ওদের বুঝিয়েছিলাম, মেয়েরা এক জোট হয়ে কাজ করলে, আমরা ওই চক্র থেকে বার হয়ে আসতে পারব,’’ বলছিলেন ছবিতা। এখন তাঁর সঙ্গে গোটা পঞ্চায়েতের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মহিলা। চলছে সাড়ে তিনশো স্বনির্ভর গোষ্ঠী। তিন ফসলি জমি কিনে ধান, আনাজ, বাদাম, আলু, হলুদ, সর্ষে, জিরে... কত কী-ই চাষ করছেন তাঁরা। বড় ব্র্যান্ড এসে কিনে নিচ্ছে ঢেঁকিছাঁটা চাল। চলে যাচ্ছে ভিন্‌ রাজ্য থেকে দেশান্তরেও। যে গ্রামে একটাও পাকা বাড়ি ছিল না, সেখানে এখন সবই প্রায় পাকা দেওয়াল। যে পুরুষেরা মেয়েদের বেরোতে দিতেন না, তাঁরাই এখন মহিলাদের জোগাড়ে।

ছবিতার উঠোনে খেলা করে শরতের রোদ। সামনের গেলাসে যে সরবত, সেটাও নিজের গাছের লেবুর। লাজুক মুখে গল্প বলে চলেন।

‘‘এ গ্রামে পুজো বরাবরই হত। তবে টানাটানির সংসারে যেমন হয় আর কী! যে বছর পুরুষেরা ফসলের দাম ভাল পেতেন, টাকা দিতেন।’’ কিন্তু এক সঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া, হইহুল্লোড়, নাচগান? সে সবে কোথাও খামতি ছিল যেন। ধীরে ধীরে ছবিতাদের দল বাড়ল। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন সুজাতা, চঞ্চলা, মৌসুমীরা। পুজোও ধীরে ধীরে চলে গেল মেয়েদের হাতে। সেই মহিলা কমিটিই এখনও পুজো পরিচালনা করে। খরচও তারাই দেয়। পুজোর চার দিন পুরো গ্রাম যেন আলো হয়ে থাকে।

ছবিতার মুখের উপরে এসে পড়েছে পশ্চিমের রোদ। এক ছুটে এসে পিছন থেকে গলাটা জড়িয়ে ধরল নাতনি। নাচ সেরে এসেছে সে। ছোট্ট মেয়ের সাজ, পায়ে আলতা দেখে মনে হল, বোধনের বাকি নেই আর। ছবিতা এগিয়ে যান কথায় কথায়, ‘‘এখন কম্পিউটার শিখেছি। হিসাব রাখা, নাম এন্ট্রি করতে পারি।’’ আর অনলাইনে কেনাকাটি করেন না? বলে চলেন, ‘‘সেটা এখনও করিনি। তবে দেখি নানা জিনিস। ফোনেই যেন বাজার।’’ এই বাজারের খরিদ্দার কিন্তু বিশ্বজোড়া। অনলাইনে আপনাদের মশলা, চাল বিক্রি করতে পারেন তো! শুনেই জানতে চাইলেন, কী ভাবে হয় সে সব? চোখে-মুখে নতুন কিছু জানার অপার আগ্রহ। তার পরে বললেন, দু’একটি সংস্থা তাঁদের পণ্য বাজারজাত করে দেয়। বাঁকুড়া ছাড়িয়ে দুর্গাপুর ও আশপাশের বাজারে দিব্যি সড়গড় তাঁরা। পুজোয় গ্রামেই থাকেন তাঁরা। তবে পুজোর পরে বেড়াতে যান মাঝেসাজে। ছবিতা বলেন, ‘‘আমাদের নুন, মরিচের জীবনে পুজোটা যেন চিনি। একটু স্বাদবদল। একটুখানি থেমে থাকা। কিন্তু চিনি যেমন বেশি সহ্য হয় না শরীরে, তেমনই বিশ্রামও আমাদের জন্য নয়। পরিশ্রমই চলতে থাকার চাবিকাঠি।’’

তাই তো মাঠে এখনও নিজে ধান কাটেন, আনাজ বসান, ধান ভাঙেন। সংসারের সব কাজ করে বসেন সঙ্ঘের হিসাব-নিকাশ নিয়ে। স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও একে অন্যের হাত ধরে থাকেন তাঁরা। বাড়ির, সংসারের, নিজেদের কাজের, সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে কারও উপর নির্ভর করতে হয় না। ভান্ডার তো ওঁদের অন্নপূর্ণার মতো ভরে থাকে।

গ্রামের মণ্ডপে প্রতিমা তখনও বসেনি। একচালা ঠাকুর হয়। পিছনে সাবেক সেই চালচিত্র। দশপ্রহরণধারিণী দুর্গা চার দিন চারদিক আলো করে থাকেন লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী, মহিষাসুরকে নিয়ে। ছবিতার একচালা সংসারেও চাষবাস, নদী, সংসার, ভবিষ্যৎ, অন্য মহিলারা মিলেমিশে থাকেন। আশ্বিনের হাওয়ায় দোলে কাশফুল। ভোররাতে শিউলির গন্ধে ভরে ওঠে চরাচর।

মেয়েদের হয়ে কতগুলো অসুরকে যে হারিয়েছেন ছবিতা!

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Self reliance bankura

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy