মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে এক যুবককে খুনের ঘটনায় ‘নিচুতলার’ পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ। পুলিশ আধিকারিক এবং কর্মী মিলিয়ে চার জনকে শাস্তি দেওয়ার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, যিনি রাজ্যের পুলিশমন্ত্রীও বটে। এই ঘটনায় জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার সুপার সুরিন্দর সিংহকে শো কজ় করেছে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতর। তাঁকে কারণ দর্শাতে বলার পাশাপাশি সতর্কও করা হয়েছে।
গত ২৮ অগস্ট মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুজিত মণ্ডল বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। তার পর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত ২ সেপ্টেম্বর ফরাক্কার ফিডার ক্যানালের পাশ থেকে ৩৬ বছর বয়সি ওই যুবকের খণ্ডবিখণ্ড দেহ পাওয়া যায়। এই খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও নিচুতলার পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন যে, নিহতের স্ত্রী পুলিশকে জানালেও নিচুতলার পুলিশের কাজে গাফিলতি ছিল।
এই ঘটনার তদন্তভার সিআইডি-কে দিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে ধুলিয়ান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ, এএসআই সুমন্ত দাস এবং শমসেরগঞ্জ থানার এসআই (সেকেন্ড অফিসার) সইফুল আলমকে সাসপেন্ড (নিলম্বিত) করা হয়েছে। থানার আইসি সুব্রত ঘোষকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ় করার কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। আর ফরাক্কার এসডিপিও শেখ সামসুদ্দিনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে।
সোমবার সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২৮ তারিখেই পুলিশের কাছে মিসিং ডায়েরি করেছিলেন নিহত যুবকের স্ত্রী সুমনা মণ্ডল। ৩০ সেপ্টেম্বর এফআইআর দায়ের করেন তিনি। সুমনার অভিযোগ, ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে রিয়ান আখতার নামের এক যুবক ফোন করে ডেকে নিয়ে যান তাঁর স্বামীকে। তার পর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি সুজিতের। ২ সেপ্টেম্বর তাঁর খণ্ডবিখণ্ড দেহ উদ্ধার হয়। এই ঘটনায় সামিউল শেখ, তাজকিরা বিবি এবং জনি শেখ নামে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর শুভেন্দু এই ঘটনায় উদ্বেগপ্রকাশ করে বলেন, “হরগোবিন্দ দাস, চন্দন দাসদের মতো করে খুন করা হয়েছে। পুলিশকে জানানো হলেও স্থানীয় পুলিশের তরফে গাফিলতি রয়েছে। নিচুতলার পুলিশ গুরুত্ব দেয়নি। তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের।” মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইজি জ়োনাল এই ঘটনার বিভাগীয় তদন্ত করবেন। ওই সূত্রের দাবি, পরিকল্পনা করে ২৮ অগস্ট ফোন করে ডেকে নিয়ে গিয়ে ধুলিয়ানের এক নির্জন জায়গায় সুজিতকে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। প্রমাণ ঢাকতে দেহ টুকরো করে দু’টি সিমেন্টের বস্তায় ভরে মোটরসাইকেলে চাপিয়ে বল্লালপুর ঘাটে নিয়ে গিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় দেহের বাকি অংশের সন্ধানে স্পিডবোট এবং ডুবুরি নামিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া দেহাংশ ময়নাতদন্তের জন্য জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিচয় সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে ফরেন্সিক এবং ডিএনএ পরীক্ষা করানো হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, সুজিতের পরিবারের তরফে নিখোঁজ ডায়েরি করার পর তদন্ত শুরু হয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং কল ডিটেলস খতিয়ে দেখে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের টানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে মেলে বড়সড় সূত্র। ২ সেপ্টেম্বর বিকেলে ফরাক্কার বল্লালপুর ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় প্লাস্টিক ও বস্তাবন্দি দেহাংশের কিছু অংশ। তদন্তকারীদের সূত্রে, ব্যবসায়িক গোলমালের সূত্রেই এই খুনের ঘটনা।
ধুলিয়ানের এই খুনের ঘটনা নিয়ে বলতে গিয়ে হরগোবিন্দ এবং চন্দনকে খুনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গত বছর অশান্ত হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদ। হিংসা ছড়িয়েছিল জঙ্গিপুরের শমসেরগঞ্জ, সুতি, ধুলিয়ানের মতো অঞ্চলে। শমসেরগঞ্জে এই অশান্তিতে প্রাণ হারান হরগোবিন্দ এবং চন্দন। সম্পর্কে তাঁরা পিতা-পুত্র। অভিযোগ, ঘরের ভিতর থেকে বাবা-ছেলেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ১৩ জনকে গত বছরের ডিসেম্বরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল জঙ্গিপুর আদালত। বিচারক এ-ও জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত রোষে ওই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি নিয়ে সে সময় বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে।