রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পাঁচ মাসের মাথায় মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প বা ‘১০০ দিনের কাজ’-এর বকেয়া অর্থ মেটানোর তোড়জোড় শুরু করল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। তবে ঢালাও অর্থবণ্টন নয়, উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ও সরকারি নথি খুঁটিয়ে যাচাই করেই প্রাপকদের বকেয়া টাকা হস্তান্তরের পথে হাঁটছে নবান্ন। ভুয়ো সুবিধাভোগী চিহ্নিত করতে এবং প্রকল্পের প্রকৃত পাওনাদারদের নির্ভুল হিসাব চূড়ান্ত করতে জেলায় জেলায় জোরদার পুনর্যাচাই প্রক্রিয়ার নির্দেশ দিল রাজ্য প্রশাসন। গত ২৯ অক্টোবর রাজ্যের সব জেলাশাসককে এই মর্মে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা পাঠিয়ে দিয়েছে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের শেষ পাঁচ বছরে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম জ্বলন্ত ইস্যু ছিল এই ১০০ দিনের কাজের বরাদ্দ। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত ভাবে বাংলার গরিব মানুষের টাকা আটকে রাখার অভিযোগ তুলে বারবার সরব হয়েছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার।
অন্য দিকে, তৎকালীন বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এনে অর্থ বরাদ্দে রাশ টানার দাবি জানিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। যার জেরে ২০২২ সালের ৯ মার্চ থেকে বাংলায় ১০০ দিনের কাজের অর্থ বরাদ্দ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল নয়াদিল্লি। সেই সময় কেন্দ্র টাকা না দেওয়ায় রাজ্য কোষাগার থেকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে প্রায় ৩০ লক্ষ জব কার্ডধারীর মজুরি মিটিয়ে দেওয়ার দাবি করেছিল মমতা সরকার। ক্ষমতা বদলের পর সেই বকেয়া নিয়েই এ বার সক্রিয় হল বর্তমান প্রশাসন। রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রীরা বারবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিংহয়ের দারস্থ হলেও, সমস্যার সমাধান হয়নি বলেই অভিযোগ করে তৃণমূল সরকার। পরে বিষয়টি নিয়ে দিল্লিতে জমায়েত করেছিলেন তৎকালীন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই অভিযোগের সুরাহা হয়নি বলেই অভিযোগ করেছিল তৎকালীন শাসকদল। বরং রাজনৈতিক স্বার্থে সেই অর্থ পাঁচ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার আটকে রেখেছিল বলেই অভিযোগ।
আরও পড়ুন:
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের গাইডলাইন মেনেই ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ ও তার পূর্ববর্তী বকেয়ার হিসাব নিরীক্ষণ করা হবে। তবে কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে নাম থাকলেই সরাসরি প্রাপক হিসেবে গণ্য করা হবে না। বাস্তবে কাজ হয়েছে কি না, উপযুক্ত প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত অনুমোদন ছিল কি না, খরচের সঠিক খতিয়ান রয়েছে কি না এবং অর্থ অন্য কোনও খাতে সরানো হয়েছিল কি না— তা পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখা হবে। এ জন্য ব্লক, জেলা এবং রাজ্য—এই ত্রিস্তরীয় স্ক্রুটিনি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। দফতরের বেঁধে দেওয়া কড়া সময়সীমা অনুযায়ী, আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে ব্লক পর্যায়ের যাচাই শেষ করতে হবে। জেলা স্তরের অনুসন্ধান ও রিপোর্ট জমার অন্তিম সময়সীমা ৩০ নভেম্বর। এর পর রাজ্য স্তরে সমস্ত তথ্য যাচাই ও ছাড়পত্রের কাজ সারা হবে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে। সবশেষে নিরীক্ষিত ও চূড়ান্ত প্রত্যয়িত বকেয়া হিসাব ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের কাছে পাঠাবে রাজ্য সরকার।
প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য, এই যাচাই প্রক্রিয়া শুরুর অর্থ কিন্তু সকলের টাকা মেলার নিশ্চয়তা নয়। তদন্তে যে দাবিগুলি সম্পূর্ণ নিয়মমাফিক ও বৈধ প্রমাণিত হবে, কেবল সেগুলির ভিত্তিতেই তৈরি হবে চূড়ান্ত বকেয়া তালিকা। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের হিসাব এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছে, সেগুলি পৃথক ভাবে বিবেচনা করবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক।