মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে প্রথমবার মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে পা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার মতুয়া গোঁসাই সম্মেলনে যোগ দিয়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের জন্য এক গুচ্ছ ঘোষণা করলেন তিনি। মতুয়াদের নাগরিকত্বের আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘চিকিৎসা, ভাতা, যা যা প্রয়োজন নিয়ম মেনে সব করে দেব। এই সরকার আপনাদের সরকার।’’
ঠাকুরবাড়িতে বিভাজনের রাজনীতি ঢোকানো হয়েছিল বলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় (বালু) মল্লিককে নিশানা করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে আর ভেদাভেদ থাকবে না। কোনও বিভাজন থাকবে না। নিজের সরকারি গাড়ি ছেড়ে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের গাড়িতে চেপে ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কামনাসাগর-সহ হরিচাঁদ ঠাকুর এবং গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দির ঘুরে দেখেন। ঠাকুরবাড়িতেই মধ্যাহ্নভোজ সারেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পর মতুয়া গোঁসাই সম্মেলনের মঞ্চ থেকে মতুয়া সমাজের উন্নয়নে একাধিক বড় ঘোষণা করেছেন। শুভেন্দুর বক্তব্যে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব পেয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে প্রায় আড়াই লক্ষ সিএএ আবেদনকারী রয়েছেন। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শুনানি শেষ করে যোগ্য আবেদনকারীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সিএএ শংসাপত্র পেয়ে গিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। সিএএ শংসাপত্রপ্রাপ্ত তফসিলি জাতিভুক্ত মানুষদের এসসি সার্টিফিকেট পেতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, সে জন্য মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। আগামী জানুয়ারিতে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হলে সিএএ শংসাপত্রপ্রাপকদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার বিষয়েও রাজ্য উদ্যোগী হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
মতুয়া সমাজের সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও একাধিক প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর গলায়। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মতুয়া মহিলাদের অন্নপূর্ণা যোজনায় মাসে তিন হাজার টাকা এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তিদের মাসে দেড় হাজার টাকা বার্ধক্য ভাতা দেওয়ার বিষয়ে রাজ্য উদ্যোগী হবে বলে জানিয়েছেন। পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা যাতে তাঁরা পান, সেই ব্যবস্থাও করা হবে। মতুয়া সমাজের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে একজন নির্দিষ্ট আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
আরও পড়ুন:
সভা থেকে মতুয়া উন্নয়ন বোর্ড পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন মুখ্যমন্ত্রী। চলতি অর্থবর্ষে বোর্ডের মাধ্যমে বিশেষ উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ৫০ কোটি টাকা খরচ করা হবে বলে জানান তিনি। আগামী ছ’মাসের মধ্যে চাঁদপাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বীণাপাণি দেবীর নামে ওই হাসপাতালের নামকরণ করা হবে বলেও জানান তিনি। শিশুদের চিকিৎসার জন্য এসএনসিইউ এবং প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনঔষধি কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনার কথাও বলেন। আগামী বাজেটে ঠাকুরনগরকে পুরসভা হিসেবে ঘোষণা করার প্রতিশ্রুতিও দেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুধু উন্নয়নমূলক প্রকল্পই নয়, ঠাকুরবাড়ির মন্দির সম্প্রসারণের বিষয়েও উদ্যোগী হওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঠাকুর পরিবারের ট্রাস্টের অধীন জমিতে একটি বৃহৎ মন্দির তৈরির জন্য ডিপিআর বা বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরি করতে আর্কিটেক্ট পাঠানো হবে। তীর্থক্ষেত্র সার্কিটের আওতায় এই মন্দির নির্মাণ হবে বলে জানান তিনি। মন্দিরের ভূমিপুজোয় নিজে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।
বারুণী মেলাকে কেন্দ্র করে কোনও আইনি জটিলতা বা বিভাজনের রাজনীতি বরদাস্ত করা হবে না বলে বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারি উদ্যোগে মেলাকে বিশেষ সহযোগিতা করা হবে এবং জাতীয় মেলার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি। অতীতের তৃণমূল সরকারের প্রসঙ্গ টেনে ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র করে বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করার বার্তাও দেন শুভেন্দু। মতুয়া ঠাকুরবাড়ির সদস্য তথা উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দফতরের প্রাক্তন মন্ত্রী মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরের ভূয়সী প্রশংসা শোনা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর গলায়। বক্তব্যের শুরুতেই হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর-সহ বীণাপাণি দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান মুখ্যমন্ত্রী। ঠাকুর পরিবারের প্রবীণ সদস্য মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। বলেন, ‘‘একটি জায়গায় মঞ্জুল ঠাকুরের সঙ্গে মিল রয়েছে। তিনিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ২০২০ সালে আমিও করেছিলাম। আমি মঞ্জুল ঠাকুরের পথ অনুসরণ করেছি।’’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর এবং বাগদার বিধায়ক সোমা ঠাকুরেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী। মতুয়া সমাজকে নাগরিকত্ব নিয়ে আশ্বস্ত করে শুভেন্দু বলেন, ‘‘এই সরকার শুধু কোনও রাজনৈতিক দলের সরকার নয়, এটি মতুয়া সমাজেরও সরকার। তাঁদের দাবি ও অধিকার পূরণে সরকার দায়বদ্ধ। এই সরকার আপনাদের সরকার। নিশ্চিন্তে থাকুন।’’
সব মিলিয়ে মতুয়া-ভূমি থেকে সিএএ, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, মন্দির নির্মাণ এবং পুরসভা গঠনের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।