স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, রক্তের কোনও ঘাটতি নেই। এ দিকে বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ বলছেন, সাধারণ মানুষের রক্ত পেতে সমস্যা হচ্ছে! রক্তের জোগান-ঘাটতি নিয়ে ভিন্ন মেরুতে শাসক শিবিরের দুই নেতা।
এই ভিন্ন অবস্থানের নেপথ্যে বৃহস্পতিবার রাতে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি ঘটনা। ওই দিন পরিচিত এক রোগীর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে রক্ত পেতে সাধারণ মানুষ কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তা উপলব্ধি করেন সজল। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ বিধায়ক বলেন, ‘‘বিধায়ককে রক্তের জোগাড় করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা!’’
এই মন্তব্যের প্রেক্ষিত বুঝতে হলে বৃহস্পতিবার রাতে এনআরএসের ব্লাড ব্যাঙ্কে বিজেপি বিধায়কের সঙ্গে কী ঘটেছিল তা জানতে হবে। যে ঘটনার ভিডিয়ো আনন্দবাজার ডট কমের হাতে রয়েছে। এনআরএস হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন বান্টি দাস নামে এক ব্যক্তির শুক্রবার অস্ত্রোপচারের জন্য ‘ও’ পজ়িটিভ গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন ছিল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, শুক্রবার সকালের মধ্যে রক্ত না পেলে অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দেওয়া হবে। সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের দিন সহজে পাওয়া যায় না। এই পরিস্থিতিতে রক্ত জোগাড় করতে না পেরে বিজেপি বিধায়কের দ্বারস্থ হন ক্রিক রো’য়ের বাসিন্দা ওই রোগীর পরিজনেরা। অস্ত্রোপচারের রোগীর রক্তের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য পরিজনদের ফোনে ব্লাড ব্যাঙ্কে কর্তব্যরত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে চান সজল। বিজেপি বিধায়কের আর্জি ছিল, ‘ও’ পজ়িটিভ গ্রুপের রক্ত না থাকলে রিক্যুইজিশনে লিখে দেওয়া হোক। কর্তব্যরত কর্মী তা লিখতে রাজি হননি। এর পর রোগীর পরিজনের ফোনের স্পিকারে কর্তব্যরত কর্মীর সঙ্গে সজল কথা বলতে চান। অভিযোগ, বিধায়ক পরিচয় দেওয়ার পরও কর্মী কথা বলতে চাননি। বারবার অনুরোধ করার পরও কাজ না হওয়ায় রাতেই এনআরএসের ব্লাড ব্যাঙ্কে পৌঁছে যান বরাহনগরের বিধায়ক। তাতে কাজ হয়। এনআরএস পৌঁছে প্রথমে ব্লাড ব্যাঙ্কের ইনচার্জ দিলীপ পণ্ডা, পরে এমএসভিপি মানবেন্দ্র সরকারকে ফোনে ঘটনার কথা জানানো হয়। এর পরই ওই রোগীর রক্তের ব্যবস্থা হয়ে যায়। ফোনে এমএসভিপি’কে সজল জানান, একটি মেডিক্যাল কলেজের ব্লাড ব্যাঙ্কে রাতে রক্ত টানার কোনও ব্যবস্থা নেই। রক্তের ঘাটতি মেটানোর এনআরএসের অনুরোধে এর আগে একাধিকবার রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেছেন সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা। সেই জায়গা থেকেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রাপ্ত কার্ড জমা করে তিনি একজন অস্ত্রোপচারের রোগীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছিলেন। এমএসভিপি’র কাছে বিধায়কের প্রশ্ন, রক্ত না থাকলে পোর্টাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য ঘেঁটে কোথায় গেলে রক্ত মিলবে, তা তো ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মীদেরই জানানোর কথা। সেই সকল নিয়মকে শিকেয় তুলে রোগীর পরিজনদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ? এর পরই সজলের প্রশ্ন, ‘‘একজন এমএলএ হয়ে যদি আমার এই অবস্থা হয়, তা হলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা?’’
ঘটনাচক্রে, পুজোর আগে মানিকতলা সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কেও একই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল বিজেপি বিধায়কের। রক্তের কি ঘাটতি রয়েছে? সজলের জবাব, ‘‘সবটা আপনাকে বলতে পারব না। তবে সরকারের রক্তের বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।’’ কী রকম? বিজেপি বিধায়কের দাবি, বেসরকারি ব্লাডব্যাঙ্কগুলির বিরুদ্ধে অভিযানের জেরে একশ্রেণির স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বার্থে ঘা লেগেছে। সেই জন্য সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য রোগীদের হয়রানির মুখে ফেলা হচ্ছে। সজলের কথায়, ‘‘সাবোটাজ চলছে। এই সকল সরকারি কর্মীদের বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে আঁতাঁত ছিল। বেসরকারি ব্লাডব্যাঙ্কগুলির উপরে সরকার নিয়ন্ত্রণ জারি করার পর এরা সাবোটাজ করছে।’’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মত ভিন্ন। তাঁর কথায়, ‘‘এনআরএস থেকে হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটা সার্বিক ছবি নয়।’’
রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমাজকর্মীদের পাশাপাশি সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্তারা অবশ্য চাহিদা অনুযায়ী জোগানে ঘাটতির কথাই বলছেন। এনআরএসের ব্লাড ব্যাঙ্কের ইনচার্জ দিলীপ পাণ্ডা বলেন, ‘‘পুজোর মরসুমে রক্তদান শিবির কম হওয়ায় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।’’ শহর কলকাতার সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘সব গ্রুপের রক্তের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।’’ পুজোর সময় শিবির কম হওয়ার কথা বলছেন তিনিও।
সেই সূত্রেই রক্তদান আন্দোলনের সমাজকর্মী দীপঙ্কর মিত্র প্রশ্ন তুলেছেন, পুজোর মরসুমে রক্তদান শিবির কম হওয়ায় যদি এখন রক্তের জোগানে টান পড়ার কারণ হয়, তা হলে নবমীর দিন পার্ক সার্কাসের রক্তদান শিবির বন্ধ করে দেওয়া হল কেন? সেদিন পার্ক সার্কাসের সাত মাথার মোড়ে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের তত্ত্বাবধানে মোবাইল ভ্যানে রক্তদান শিবিরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অনুমতি না থাকার কারণ দেখিয়ে সেই শিবির পুলিশের তরফে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। তা নিয়ে টানাপড়েনেও চলে বিস্তর। প্রথমে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে শিবির বন্ধ করার জন্য বলা হয়। তাতে কাজ না হওয়ায় স্বাস্থ্য ভবনের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিবির বন্ধ করে দেওয়া হয়। দীপঙ্কর বলেন, ‘‘পুজোর পরে রক্তের জোগানে টান পড়বে সে কথা মাথায় রেখেই এই শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। এর আগেও জরুরি ভিত্তিতে রক্তদান শিবির হয়েছে। তাহলে এবার অনুমতি নিয়ে সমস্যা তৈরি করার আগে রক্তের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হল না কেন?’’ পাশাপাশি দীপঙ্করের আরও অভিযোগ, ২২ থেকে ২৫ অক্টোবর মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে রক্তদান শিবিরের জন্য আবেদন করেও সাড়া মেলেনি রাজ্য রক্ত সঞ্চালন পর্ষদের তরফে। ফলে দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে রক্তদান শিবির করার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে।
রক্তদান শিবির।
অন্য দিকে, দীপঙ্কর জানান, পার্ক সার্কাসের ঘটনার প্রেক্ষিতেই মোবাইল ভ্যানে রক্ত সংগ্রহ করতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয় তার জন্য শনিবার দফতরের আধিকারিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পার্ক সার্কাসের ঘটনারও সাক্ষী সজল। এ দিন তিনি বলেন, ‘‘পার্ক সার্কাসে যে ভাবে পুলিশ রক্তদান শিবির বন্ধ করেছে তা ঠিক হয়নি। আমি নিজে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ফোন করে সে কথা জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, কাজটা ঠিক হয়নি।’’