Advertisement
E-Paper

সব পুরসভা কার্যত অকেজো, চিকিৎসক-আশাকর্মীরা ব্যস্ত আয়ুষ্মানে, শীত দেরিতে আসতে পারে, ডেঙ্গি নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে

শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ডেঙ্গির বাহক এডিস এখন গ্রামাঞ্চলেও ঘাঁটি গেড়েছে। জলপাইগুড়ির মাল থেকে খাস কলকাতা। সর্বত্র নেটওয়ার্ক তৈরি করে বসে রয়েছে এডিস।

সৌরভ দত্ত

শেষ আপডেট: ৩০ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০১
How will West Bengal Government tackle Dengue this year

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গি আক্রান্তেরা। —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

বিপদ চেনা। বিপদকে রুখে দেওয়ার কৌশলও জানা। তবুও পরিবর্তনের বছরে ডেঙ্গি রোধে প্রত্যাশিত ফল মিলবে কি? এই আশঙ্কাই এখন রাজ্যের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

বৃষ্টি বন্ধ হতেই নতুন সরকারের আমলে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষায় বসবে স্বাস্থ্য ভবন। তারই প্রস্তুতি হিসেবে গত মঙ্গলবার ডেঙ্গি সংক্রান্ত একটি পর্যালোচনা বৈঠক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, এ পর্যন্ত ডেঙ্গির কারণে মৃত্যু হয়েছে মোট সাত জনের। ডেঙ্গি পজ়িটিভ রোগীর মৃত্যু ধরলে সংখ্যাটা ১০। স্বাস্থ্য ভবনের তথ্য বলছে, অগস্টের ১৯ তারিখ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা হল ৪,০৩৫। আক্রান্তের হার ০.৭ শতাংশ। গত বছর এই সময় (বছরের প্রথম ৩৩ সপ্তাহ) আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬,৪৮৮ জন। আক্রান্তের হার ছিল ১.০ শতাংশ। ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর আক্রান্তের হার আপাতদৃষ্টিতে কম বলে মনে হলেও টেস্টের সংখ্যা গত বছরের নিরিখে এ বছর কম। ২০২৫ সালে ডেঙ্গির কারণে মৃত্যু হয়েছিল ১৯ জনের।

শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ডেঙ্গির বাহক এডিস এখন গ্রামাঞ্চলেও ঘাঁটি গেড়েছে। জলপাইগুড়ির মাল থেকে খাস কলকাতা। সর্বত্র নেটওয়ার্ক তৈরি করে বসে রয়েছে এডিস। রাশ আলগা হলেই বিপদ অবশ্যম্ভাবী। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, এ বছর রাজ্যের যে সকল অঞ্চলে আচমকা ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তা হল, জলপাইগুড়ির মাল, মাটিয়ালি। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি, রঘুনাথগঞ্জ দু’নম্বর ব্লক। পূর্ব বর্ধমানের ভাতার, পূর্বস্থলি ১ নম্বর ব্লক। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় ১, ভাঙড় ২। নদিয়ার তেহট্ট (১ নম্বর ব্লক), চাকদহ। পরিসংখ্যান বলছে, অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্তের নিরিখে শীর্ষে রয়েছে কলকাতা (২৬৪)। এর পর দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম স্থান দখল করে রেখেছে ভাঙড়-২ (৮৬), হাওড়া (৭৮), পূর্বস্থলি-১ (৬৭), আসানসোল (৬৫)।

এই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষিতেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, পুরসভা, পঞ্চায়েতগুলি কোমর বেঁধে না নামলে এডিসের নেটওয়ার্ককে বাগে আনা মুশকিল। এই আশঙ্কার একটি বড় কারণ, রাজ্যের সাতটি পুরনিগম, ১১৯টি পুরসভার প্রায় কোথাও কোনও নির্বাচিত বোর্ড নেই। কাউন্সিলরদের দেখা নেই ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। ৩৩৯০টি গ্রাম পঞ্চায়েতেরও তথৈবচ অবস্থা। পঞ্চায়েত প্রধানেরা কার্যত নিখোঁজ। এই পরিস্থিতির জন্যই একশো দিনের কাজে গতি আনতে বিধানসভায় সংশোধনী বিল আনতে বাধ্য হয়েছেন পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ।

ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের জনস্বাস্থ্য আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, প্রতি বছর লার্ভা নিধনের কাজে জেলায় জেলায় জনপ্রতিনিধিরাই কার্যত নোডাল অফিসারের কাজ করতেন। ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল, ভেক্টর বর্ন ডিজিজ কন্ট্রোলের অন্তর্গত স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন। এলাকার কোথায় লার্ভা রয়েছে তার খোঁজ এই স্বাস্থ্যকর্মীরাই দেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয় পরবর্তী রণকৌশল। এতদিন ওয়ার্ডে, পঞ্চায়েতে ডেঙ্গি মোকাবিলার কাজে কোনও রকম সমস্যা তৈরি হলে কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধানদের সঙ্গেই যোগাযোগ করতেন স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকেরা। প্রশ্ন হল, এ বার কী হবে? রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘প্রতিটি পুরসভায় প্রশাসক তো একজনই। তাঁর একার পক্ষে জনপ্রতিনিধিদের বিকল্প হয়ে ওঠা সম্ভব? গত দশ বছরে ডেঙ্গি মোকাবিলা করতে করতে জনপ্রতিনিধিরাও জানতেন কোন পরিস্থিতিতে কী পদক্ষেপ করতে হবে। প্রশাসকদের কি সেই অভিজ্ঞতা রয়েছে?’’

স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, ডেঙ্গি ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের মধ্যে এ বছরও ডেন-২’এর আধিক্য বেশি। একেবারে গোড়ায় সতর্ক না হলে ডেন-২ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত যে সকল ব্যক্তি দ্বিতীয় বার ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদের জন্য ডেন-২ হল মারাত্মক।

শনিবার একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে শারদ্বত বলেন, ‘‘সামনের তিন মাস ডেঙ্গির মোকাবিলা করা সত্যিই চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য ভবন তৎপর রয়েছে। দেখি আমরা কতটা কী করতে পারি।’’ স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে এ বছর শীত আসতে দেরি হতে পারে। তাই নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গির প্রকোপ থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই বলে বক্তব্য স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের।

প্রথম বিজেপি সরকারের কাছে ডেঙ্গি মোকাবিলা যে চ্যালেঞ্জ, তা মানছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তো বলছেন, পুরনিগম, পুরসভা, পঞ্চায়েত স্তরে কী সেই চ্যালেঞ্জ আত্মস্থ করতে পারছেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা? তৃণমূল স্তরের জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে এ বছর ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে তাঁদের ভূমিকাই তো আসল। কলকাতা পুরসভা-সহ জেলাস্তরের পুরসভাগুলির স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসক, আশা কর্মী, ভেক্টর বর্ন ডিজ়িজ় কন্ট্রোলে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের বক্তব্যে সেই আত্মবিশ্বাস কোথায়? কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, খাস কলকাতায় অবস্থিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকেরা ‘আয়ুষ্মান ভারতে’র তথ্য আপলোডের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আর উপভোক্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই তথ্য যাচাইয়ের কাজ করছেন আশা কর্মীরা। জেলার পুরসভাগুলিতে দিনভর একই কাজ করছেন সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা। ফলে বাড়ি বাড়ি জ্বরের খোঁজ রাখার পাশাপাশি ডাবের খোলা, টায়ার,পরিত্যক্ত পাত্রে থাকা জমা জলে মশার বংশবৃদ্ধির পরিস্থিতির উপরে যাঁরা নজর রাখতেন তাঁদের দেখা মিলছে না! কলকাতা পুরসভার পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ বলেন, ‘‘ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের কাজ কোনও না কোনও প্রশাসনিক আধিকারিকেরা পরিচালনা করতেন। তাঁদের মাথায় থাকতেন মেয়র পারিষদেরা। এখন তাঁরা না থাকায় অসুবিধা হচ্ছে ঠিকই। তবে এই অসুবিধার জন্য দায়ী কে? দায়ী কলকাতা, সল্টলেকের প্রাক্তন মেয়রেরা। তাঁরাই তো বোর্ড ভেঙে দিয়ে পালিয়ে গেলেন। বিজেপি কোথাও বলপ্রয়োগ করে বোর্ড ভাঙেনি। এরাই বোর্ড ভেঙে পালিয়ে গিয়েছেন। এখন সাধারণ মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে আমরা বিধায়কেরা মাঠে ময়দানে আছি।’’

পশ্চিমবঙ্গ পৌর স্বাস্থ্যকর্মী ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদিকা পৌলমী করঞ্জাই বলেন, ‘‘মশার লার্ভা নিধনের কাজে যাঁরা যুক্ত থাকেন তাঁরা এখন আয়ুষ্মান ভারতে ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের কাজ করছেন। সব পুরসভার এক অবস্থা। আমরা চেষ্টা করছি, আয়ুষ্মানের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য অনেক সময় একজন বা দু’জন উপভোক্তার ডেটা আপলোড করতেই সারা দিন চলে যাচ্ছে।’’

দক্ষিণ কলকাতার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত এক পুর চিকিৎসক বলেন, ‘‘দেখা মিলবে কী করে? বাড়ি বাড়ি পরিদর্শনের তত্ত্বাবধানে থাকা চিকিৎসকেরা তো এখন শুধু আয়ুষ্মান ভারত করছেন। আশা দিদিদেরও সেই কাজ দেওয়া হয়েছে। এর উপর সমস্যা বেড়েছে আচমকা ৩৫ জন চিকিৎসকের চাকরি চলে গিয়েছে।’’ গত ১৪ অগস্ট স্বাস্থ্য ভবনের তরফে একটি নির্দেশিকা জারি করে জানানো হয়, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অন্তর্গত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে পঁয়ষট্টি ঊর্ধ্ব চিকিৎসকদের নিয়োগ বাতিল করা হল। বিকল্পের ব্যবস্থা না করেই একলপ্তে ৩৫ জন চিকিৎসকের নিয়োগ বাতিল হওয়ায় ৩ নম্বর বরো, ৪ নম্বর বরোর একাধিক ওয়ার্ডের স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন কোনও মেডিক্যাল অফিসারই নেই!

স্বাস্থ্য ভবনের রিপোর্ট বলছে, এ বছর জলপাইগুড়ি, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, নদিয়ার যে সকল এলাকায় ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা গিয়েছে সেখানে সংক্রমণের মূলে রয়েছে পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোলা, আবর্জনা। ভাতার, পূর্বস্থলিতে তো হাসপাতাল চত্বর থেকে ডেঙ্গি ছড়িয়েছে! এই পরিস্থিতিতে নজরদারেরা মাঠে না নামলে বিপদ তো অবশ্যম্ভাবী! মেডিসিনের চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘চারিদিকে যে ভাবে জল জমে রয়েছে তাতে মনে হচ্ছে এ বছর ডেঙ্গি ভোগাবে। এখনই তৎপর না হলে মুশকিল।’’ নাইসেডের প্রাক্তন অধিকর্তা শান্তা দত্ত তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নিরিখে বলেন, ‘‘আমাদের রাজ্যে বরাবরই ডেন-২ ভাইরাসের প্রকোপ দেখা গিয়েছে। স্বাস্থ্য দফতর প্রতি বছর পুরসভাগুলিকে সঙ্গে নিয়ে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের কাজ করে এসেছে। এবারও সেই গতিতে কাজ হলে আশা করি সুফল মিলবে। ডেঙ্গির ভ্যাকসিন খুব তাড়াতাড়ি ভারতে পাওয়া যাবে সেটাও একটা আশার কথা। সিডিএসসিও ডেঙ্গির টিকা বাজারজাত করার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। এটা যেহেতু কোয়াড্রিভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন, তাই চার প্রজাতির ডেঙ্গির ক্ষেত্রেই এটা কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।’’

শিশুরোগ চিকিৎসক প্রভাসপ্রসূন গিরি বলেন, ‘‘বিগত তিন বছর ডেঙ্গির প্রকোপ কমলেও এবার সত্যিই পরিস্থিতি ভিন্ন। পুরসভার স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়িতে আসা কমে গিয়েছে। এলাকার রাস্তাঘাট সব ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার কাজ অর্ধেক হয়ে পড়ে রয়েছে। সেই সব জায়গায় জল জমে থাকলে মশার উৎপত্তিস্থল হতে কতক্ষণ? কলকাতা শুধু নয়, মফস্স‌‌ল শহরগুলিতেও এখন জল জমছে। নিকাশি পরিকাঠামো তৈরি না করেই বহুতল নির্মাণে সমস্যা বাড়ছে।’’

চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে তা মেনেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘পুরবোর্ডগুলি না থাকলেও কাউন্সিলরদের কাজ বিধায়কেরা তো এখন করছেন। নইলে সিভিক সোসাইটি তো ভেঙে পড়ত, তা তো হয়নি। আমি নিজে বিধাননগর পুরনিগম, নবদিগন্ত, দক্ষিণ দমদম পুরসভার কাজ দেখছি। বিজেপির ২০৭ জন বিধায়ক রয়েছে। কোথাও কোনও অসুবিধা হবে না।’’

Dengue control Dengue fever Dengue zone

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy