প্রায় আড়াইশো বছর আগের কথা। কোনও এক বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কালীপুজোর ভার পেয়েছিল হুগলির জাঙ্গিপাড়ার তারাজল গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবার। সেই শুরু। দিন বদলেছে। প্রজন্ম বদলেছে। তবে, পরম্পরা বদলায়নি। শুধু সময়ের প্রয়োজনে দু’টি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে ওই পরিবারের কালীপুজো। সেটাও দেখতে দেখতে ৮০ বছর হয়ে গেল।
এক পরিবারে দু’টি কালীপুজো হলেও নিয়ম, আচার অবশ্য প্রায় একই। এই পরিবারের পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল প্রতিমার রং। যেখানে কোনও রাসায়নিক মিশ্রণ থাকে না। দীপান্বিতা কালীপুজোর আগের রাতে, ভূত চতুর্দশীতে দুই প্রতিমার সামনেই বড় প্রদীপ জ্বালানো হয়। দু’দিকে রাখা থাকে ইট। মাথায় থাকে চুন মাখানো থালা। সেই থালার নীচে পড়া কালির ভুষো দিয়েই প্রতিমার রং করা হয়। তা দিয়েই হয় চক্ষুদান। ওই পরিবারের সদস্য কালীদাস মুখোপাধ্যায় জানালেন, আঁটপুরের আনরবাটী গ্রামের কালীপুজো হয় ভূত চতুর্দশীতেই। সেই পুজোর ঢাকের আওয়াজ শোনার পরেই দুই প্রতিমার চক্ষুদান হয়।
মুখোপাধ্যায় পরিবারের দু’টি পুজো এলাকায় ‘বড়মা’ ও ‘ছোটমা’র পুজো হিসেবে পরিচিত। বাড়িতেই প্রতিমার চুল তৈরির রীতি রয়েছে। দু’জায়গাতেই রয়েছে বলিদান প্রথা। ভোগে থাকে মাছ, ভোট কচুর তরকারি। দেওয়া হয় পাকা শসা। পুজোর পরের দিন দুই প্রতিমার ভাসানও হয় আগে-পরেই। পারিবারিক পুজো হলেও দু’টি পুজোতেই স্থানীয়েরা শামিল হন।
ওই পরিবারের জামাই রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, মেয়ের দিকের নাতি কৌশিক চট্টোপাধ্যায়েরা বলেন, ‘‘পাশের পাড়ার ছেলেরা এসে কাঁধে করে দু’টি প্রতিমা নিয়ে যান। তাঁরাও বংশ পরম্পরায় আসছেন। এটাই রীতি। পুজোর পরের দিন অনেকে ভোগপ্রসাদও নিয়ে যান।’’
ওই পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিমার ভাসান হলেও কাঠামোর ভাসান হয় না। ভাসানের দিন কয়েক পরে দু’টি কাঠামোই তুলে আনা হয়। তার আট দিন পরে দুই কাঠামোকেই পুজো করা হয়। এর পর চলে তার নিত্যপুজো। জন্মাষ্টমীর দিন দুই কাঠামোতেই প্রথম মাটি দেওয়া হয়। সেই মাটি আসে ওই পরিবারের পুকুর থেকেই। বাড়িতে তৈরি হয় নারকেল নাড়ু, মুড়কি। দুই পরিবারের আত্মীয়দের আনাগোনা শুরু হয় কালীপুজোর আগের দিন থেকে।
তারাজলের মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজোর আর্থিক দায় অনেক আগে ভাগ হয়ে গেলেও শিকড়ে কিন্তু কোনও ভাগ হয়নি। অর্জিত ঐতিহ্য একই সঙ্গে সযত্নে বহন করে চলেছেন তাঁরা।