রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা আল কায়েদার ‘সুপ্ত’ নেটওয়ার্ক খুঁজে বার করতে তদন্ত শুরু করল জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। ২০২২ সালে রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের করা একটি মামলার সূত্র ধরে নতুন করে দু’টি এফআইআর করল এনআইএ। মামলায় মূল অভিযুক্ত আল কায়েদা-উপমহাদেশ (আল কায়েদা ইন সাব কন্টিনেন্ট- আকিস)-এর ‘দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা’ বলে যাঁকে দাবি করা হয়, সেই আবু তালহা ওরফে ইক্রামুল হক।
শনিবার এনআইএ তাদের এফআইআর-এ উল্লেখ করেছে, আনসারউল্লা বাংলা টিমকে সামনে রেখে আল কায়দা সংগঠন বিস্তার করছে। ভারতে সংগঠনে নিয়মিত লোক নিয়োগ করছে। যুবকেরাই তাদের মূল লক্ষ্য। প্রথম মামলায় ইক্রামুল ছাড়াও অভিযুক্ত হিসাবে নাম রয়েছে আরও চার জনের। দ্বিতীয় মামলায় ১৯ জন অভিযুক্ত যাঁদের মধ্যে অন্তত তিন জন বাংলাদেশি নাগরিক।
গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিক এই আল কায়েদা নেতা বাংলা-সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সংগঠন বিস্তারের কাজ করেছেন। ইক্রামুল ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়েদার ‘দাওয়া’ বা সংগঠন বিস্তারের দায়িত্বে। এ রাজ্যে দিনহাটার এক বৃদ্ধ দম্পতিকে বাবা-মা পরিচয় দিয়ে ভারতীয় নথি তৈরি করে রাজ্যে ঘাঁটি তৈরি করেন ইক্রামূল।
২০২২ সালে চোরাপথে ইক্রামূল বাংলাদেশে সস্ত্রীক পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর তৈরি একটি ‘স্লিপার সেল’-এর হদিস পান রাজ্য পুলিশের এসটিএফের গোয়েন্দারা। পুরুলিয়ার বাসিন্দা আমিরুদ্দিন আনসারি ওরফে হুজুরকে ডোমজুড়ের বাঁকড়ার একটি মাদ্রাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর মধ্যপ্রদেশের ভোপালে আল কায়েদার একটি মডিউল ধরা পড়ে। গ্রেফতার হন একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক। তাঁদের সূত্র ধরেই আমিরুদ্দিনের হদিস পান গোয়েন্দারা। এই মাদ্রাসা শিক্ষকই ভোপালে আল কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ধৃতদের থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। আমিরুদ্দিনের সূত্র ধরে খোঁজ মেলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ডহারবারে সক্রিয় স্লিপার সেলের। গ্রেফতার হন সিদ্দিকী আলি, মৈনুদ্দিন তরফদার। পরে মুম্বই থেকে ধরা পড়েন জাবারুদ্দিন আলি। তদন্তে জানা যায়, এঁরা প্রত্যেকেই ইক্রামুলের হাত ধরে আল কায়েদার ‘স্লিপার সেল’ তৈরির কাজ করেছিলেন। কিন্তু তত দিনে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ইক্রামুল।
রাজ্য পুলিশের এসটিএফ ওই বছরই ইক্রামুলের হাতে তৈরি আরও একটি মডিউলের সন্ধান পায়। শাসন থেকে গ্রেফতার হন আব্দুল রাকিব সরকার ওরফে হাবিবুল্লা এবং আরামবাগের বাসিন্দা কাজি আহসান উল্লাহ ওরফে হাসান, যিনি বাইপাস সংলগ্ন পঞ্চান্নগ্রামে ঘাঁটি তৈরি করেছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। এঁদের পাকড়াও করেও ‘মাথা’ হিসাবে উঠে আসে ইক্রামুলের নাম।
এনআইএ সূত্রে খবর, ইক্রামুল ছাড়াও আমিরুদ্দিন আনসারি, সিদ্দিকী আলি, জাবারুদ্দিন আলি ওরফে মিলন পাঠানের বিরুদ্ধে নতুন এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। তাঁদের হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে চান গোয়েন্দারা। একই সঙ্গে রাকিব সরকারদের বিরুদ্ধেও নতুন মামলা করল এনআইএ। ইক্রামুলের তৈরি বলে অভিযোগ থাকা বাংলার বাকি নেটওয়ার্কগুলি কতটা এখনও সক্রিয়, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। সেই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে রাজ্যে যাতে ফের ইক্রামুল সংগঠন সক্রিয় যাতে করতে না পারেন, তার জন্য আগে থেকেই রাজ্যে আল কায়েদার ওই নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে চাইছেন গোয়েন্দারা।
রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক রিপোর্টেও আকিস বা আল কায়েদাকে এই মুহূর্তে ভারত এবং বাংলাদেশে সক্রিয় এবং শক্তিশালী জঙ্গিগোষ্ঠী হিসাবে সতর্ক করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের লালকেল্লা বিস্ফোরণে আকিস-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আকিস নতুন সেল তৈরির চেষ্টা করতে পারে বলে রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের দাবি, ইক্রামূল ২০২৩ সালে গ্রেফতার হলেও হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে তিনি জামিনে মুক্ত। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ইক্রামুল ফের পশ্চিমবঙ্গে স্লিপার সেল তৈরির কাজ করছেন। তাই জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা দ্রুত ইক্রামুলের হাতে তৈরি এই রাজ্যের আল কায়েদা নেটওয়ার্কের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছোতে চাইছে।