আল কায়েদা-উপমহাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা বাংলাদেশের মাটিতে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে বাংলাদেশের তারেক রহমান সরকারকে নিশানা করেছেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ। বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতির অংশ না হলেও এই তথ্য ভারতের জন্যও আশঙ্কার। কারণ, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি এবং সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে নজরদারি কমিটির রিপোর্ট বলছে, ‘বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আল কায়েদা- উপমহাদেশ তাদের সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করছে।’ চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।
আল কায়েদা-উপমহাদেশের ‘দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে সজীব যাঁর কথা বলেছেন, তাঁর নাম ইক্রামুল হক। রাজ্য পুলিশের এসটিএফের এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, ‘‘ইক্রামুল ওরফে আবু তালাহ জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছে। এ দেশে অন্তত ১০টা জঙ্গি কার্যকলাপ সংক্রান্ত মামলায় সে অভিযুক্ত।’’
শুধু ইক্রামুল নন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ ভারতীয় গোয়েন্দাদের কপালের ভাঁজ গভীর করেছে। তাঁদের অভিযোগ, ইসলামি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো ফের নিজেদের সংগঠন ঢেলে সাজার অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে বাংলাদেশে।
ময়মনসিংহের বাসিন্দা ইক্রামুল বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য ২০১৮ সালে উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দে আসেন। সেখানেই আল কায়েদার মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হন এবং পরবর্তী কালে উপমহাদেশে আল কায়েদা ইন সাবকন্টিনেন্ট-এর (আকিস) নিয়োগ বা ‘দাওয়া’ বিভাগের প্রধান হয়ে ওঠেন। কোচবিহারের দিনহাটার এক দম্পতিকে বাবা-মা পরিচয় দিয়ে ভারতীয় নথি থেকে শুরু করে ভারতীয় পাসপোর্টও বানান তিনি। এনআইএ-র তদন্ত রিপোর্ট বলছে, ৩৩ বছর বয়সি ইক্রামুল পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দু’বছর ছিলেন। তার মধ্যেই মধ্যপ্রদেশ থেকে শুরু করে গুজরাত পর্যন্ত একাধিক স্লিপার সেল এবং মডিউল তৈরি করেন।
গোয়েন্দাদের দাবি, মডিউলের কয়েক জনকে রাজ্য পুলিশ গ্রেফতার করার পরে ২০২২ সালে চোরাপথে বাংলাদেশে পালিয়ে যান ইক্রামুল। ঢাকা থেকে পরের বছর জুলাই মাসে সস্ত্রীক গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। অগস্টে ক্ষমতা হারান হাসিনা। আর ১০ অক্টোবর জামিন পান ইক্রামুল। তার পর থেকেই তিনি বেপাত্তা। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে তাঁর বাবা জানিয়েছেন, ছেলে নারায়ণগঞ্জের কোনও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। সে দেশের পুলিশের কাছেও এটুকুই খবর। কিন্তু এর থেকে বেশি তথ্য তারা দিতে পারেনি।
এ দেশে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের দাবি, ইক্রামুল একা নন, হাসিনা সরকারের পতনের পরে সরাসরি জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত ৩৭০ জন জামিন পেয়েছেন। এঁদের মধ্যে আনসার-উল-বাংলা টিমের মতো জঙ্গি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানি যেমন রয়েছেন, তেমনই জামাতুল মুজাহিদিন-বাংলাদেশ সংগঠনের ১৮৫ জন নেতা-কর্মী রয়েছেন। তাঁরা প্রায় প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে গোয়েন্দাদের দাবি।
এ বছর ২৬ এবং ৩১ জুলাই আশুলিয়া এবং ঢাকার মোতিঝিল এলাকা থেকে দু’টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার হয়। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে যাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি জেএমবি কর্মী। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা শহরের একটি মাদ্রাসায় আইইডি বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্তে দেখা যায়, সেখানে রীতিমতো আইইডি তৈরির কারখানা চলছিল। এই ঘটনাক্রম শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের জন্যও উদ্বেগের, বলছেন রাজ্য পুলিশের এক শীর্ষকর্তা। ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম নামে একটি সংগঠনের কয়েক জনের গ্রেফতারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই সংগঠন মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে মৌলবাদী কার্যকলাপ চালাচ্ছিল।
রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট বলছে, মূলত আফগানিস্তানের মাটি থেকেই তাদের সংগঠন চালাচ্ছে আল কায়েদা-উপমহাদেশ। পুরনো দোসর জামাতুল মুজাহিদিন-বাংলাদেশ-এর (জেএমবি) মতো সংগঠনকে অর্থ এবং অন্যান্য সাহায্য দিয়ে চাঙ্গা করে নিজেদের সংগঠন বিস্তার করতে চায় তারা। গত বছর নভেম্বর মাসে লালকেল্লার সামনে একটি গাড়ি বিস্ফোরণে ১০ জনের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার জন্য আল কায়েদা-উপমহাদেশকেই দায়ী করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট। সেই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, কী ভাবে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জঙ্গি সংগঠন হিসেবে উঠে আসছে। ছোট ছোট সেল বা মডিউল তৈরি করে গোটা সংগঠনকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে তারা। ফলে পশ্চিম এবং পূর্ব, দুই সীমান্ত থেকেই ভারতের আশঙ্কা বাড়ছে।
বাংলাদেশ সীমান্তকে সুরক্ষিত করতে গত কয়েক বছর ধরেই কেন্দ্রীয় সরকার সক্রিয়। রাজ্যে পালাবদলের পর সেই তৎপরতা বেড়েছে এ রাজ্যের সীমান্তেও। বারে বারে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে রাজ্যে আসছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অন্য দিকে, এর মধ্যেই বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (আরএডব্লিউ বা ‘র’) প্রধান পরাগ জৈন-সহ চার আধিকারিকের ঢাকা সফর তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ‘র’ কর্তারা। বাংলাদেশ এই সফর রুটিন বলে দাবি করেছে। তবে ভারতীয় গোয়েন্দাদের ইঙ্গিত, বাংলাদেশের বর্তমান জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টিও এই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
এ রাজ্যে জেএমবি এবং ইক্রামুলের বিভিন্ন মডিউল নিয়ে তদন্ত করা রাজ্য পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘সীমান্তে কড়াকড়ি হয়েছে। অনুপ্রবেশ কমেছে। কিন্তু তার আগেই যে মডিউল তৈরি হয়ে গিয়েছে, তাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে না পারলে বিপদ কমবে না।’’