শহর থেকে ঘোড়ার গাড়ি তুলে দিয়ে তার বদলে ই-এক্কাগাড়ি নামাতে চাইছে রাজ্য সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা গেলে আদি কাঠামোর এক্কাগাড়ির আদলেই পথে নামবে ই-এক্কাগাড়ি। শুধু থাকবে না গাড়ি টানার ঘোড়াটি।
রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, ময়দান তথা শহরের অন্যান্য জায়গার ঘোড়ার গাড়ির চালকদের সঙ্গে বৈঠক করে রাজ্য সরকারের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘প্রমোদভ্রমণের নামে একটি অবোলা ঘোড়াকে বিরাট ওজনের গাড়ি টানতে হয়। গাড়ি টানার সময়ে অহরহ ঘোড়ার পিঠে চাবুক চালান সহিস। আজকের দিনে এমন ঔপনিবেশিক দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। তার উপরে সিংহভাগ ক্ষেত্রেই ঘোড়ার ভরণপোষণ ঠিক মতো হয় না। ঘোড়া বুড়ো কিংবা অশক্ত হয়ে পড়লে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট অনেক দিন আগেই অবোলা প্রাণীদের প্রতি মানবিক হতে রায় দিয়েছে। নতুন সরকার সেই পথেই হাঁটতে চায়।’’
যদিও নগরোন্নয়ন দফতর সূত্রের খবর, প্রস্তাবে সায় দেননি ঘোড়ার গাড়ির মালিকেরা। ঘোড়াদের দেখাশোনা ও ভাল স্বাস্থ্যের দাবি করে তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারের এই পরিকল্পনার জেরে তাঁদের আয় বন্ধ হতে পারে। তাঁরা জানান, ঘোড়ার গাড়ি দেখে বাচ্চারা আনন্দ পায়, বিয়ের মরসুমেও এর চাহিদা থাকে। তাই তাঁরা অনড় মনোভাবই প্রকাশ করেছেন বলে খবর।
পুরমন্ত্রী জানান, বিকল্প হিসেবে ই-এক্কাগাড়ি ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের তরফে সেই গাড়ির ব্যবস্থা করা হবে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কলকাতা ও চন্দননগরে পাঁচটি ই-এক্কাগাড়ি নামানো হবে। তিনি বলেন, ‘‘ঘোড়ার গাড়ির মালিকদের বলা হয়েছে, ই-এক্কাগাড়িগুলি কী ভাবে চলছে, কত সওয়ারি পাচ্ছে, সে দিকে নজর রেখে সিদ্ধান্ত নিতে। তাঁরা চাইলেই ঘোড়ার গাড়ির বদলে ওই ধরনের ই-এক্কাগাড়ি নিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন। তবে কলকাতা শহরে একটি অবোলা ঘোড়া বিরাট গাড়ি টেনে অন্যের ভাত জোগাবে আর নিজে অভুক্ত থাকবে, সেটা কোনও ভাবেই মানা যাবে না।’’
মঙ্গলবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে ঘোড়ার গাড়ির চালকদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাঁরা কিছু বলতে চাননি। নগরোন্নয়ন দফতরের আধিকারিকেরা জানান, পশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ছাড়াও ই-এক্কাগাড়ি সাধারণ ঘোড়ার গাড়ির চেয়ে নিরাপদ। কারণ, রেড রোডে যে গতিতে গাড়ি চলাচল করে, তার মাঝখান দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি চললে যে কোনও সময়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া, ঘোড়ার গাড়িগুলি যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই জায়গা ঘোড়ার মল-মূত্রে অপরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এলাকায় দুর্গন্ধ এবং দূষণও ছড়ায়। দফতর সূত্রের খবর, মুম্বই থেকে ই-এক্কাগাড়ি পাইলট প্রকল্লের জন্য আনা হবে। সেখানে অনেক জায়গায় ওই ধরনের বৈদ্যুতিন গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে বলে খবর।
ঘোড়াদের কল্যাণে কাজ করা দু’টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। তারা সরকার তথা নগরোন্নয়ন দফতরকে রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছে, শহরে এই ঘোড়ারা করুণ পরিস্থিতির মধ্যে থাকে। একটি সংগঠনের তরফে রাধিকা বসু জানান, সরকার চাইলে ওই সব ঘোড়ার পুনর্বাসনের দায়িত্ব তাঁরা নেবেন। রাধিকা বলেন, ‘‘আমাদের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, ঘোড়া অশক্ত হলে কিংবা গাড়ি টানার ক্ষমতা হারালে, সেগুলিকে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। গাড়ির ধাক্কা-সহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা বা অপুষ্টিতে অসুস্থ হয়ে ঘোড়া রাস্তায় মরে পড়ে থাকে। মালিকের দেখা মেলে না। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই কায়িক পরিশ্রমের পরে তীব্র অযত্নে বেঁচে থাকে ঘোড়াগুলি।’’
দফতর সূত্রের খবর, বৈঠকে গাড়ির মালিকেরা তাঁদের ঘোড়াগুলি সুস্থ ও সবল বলে দাবি করলেও পুরমন্ত্রী তা মানতে চাননি। তিনি ওই সব ঘোড়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে বলে গাড়ি মালিকদের জানিয়েছেন।