দল ছাড়ার হিড়িক অব্যাহত তৃণমূলে। বুধবার মদন মিত্র বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভার সদস্যপদ ছেড়ে বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে বৈঠক করলেন কোয়েল মল্লিক। দল ছাড়ার ঘোষণা করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী মণীশ গুপ্ত। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই এল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা। বললেন, ‘‘ইডি, সিবিআই বা বিজেপি, বিভিন্ন রকম চাপের মুখে যাঁদের যাওয়ার আছে, তাঁদের অনুরোধ করছি ২১ জুলাইয়ের আগে চলে যান। লোটাকম্বল নিয়ে চলে যান।’’ তাঁর কথাতেই ইঙ্গিত, তৃণমূল পালিত শহিদ দিবসের দিন থেকেই নতুন করে দল গড়তে উদ্যোগী হচ্ছেন তিনি। বক্তব্যের একেবারে শেষে মমতার বক্তব্যের একটি অংশ তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। মমতা বলেন, ‘‘বিজেপি বলছে নামও রাখব না, নিশানও রাখব না। অনেক দল অনেক বার প্রতীক বদল করেছে।’’ বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি যোগ করেন, ‘‘ক্ষমতার জোরে দলের নামও পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু তার ভাবনা, লক্ষ্য, দৃষ্টিভঙ্গি বদল করা যায় না।’’
বুধবার মদন মিত্র মমতার হাত ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন বিদ্রোহী ঋতব্রত শিবিরে। পরের দিনই পদত্যাগের পর কোয়েল মল্লিককে দেখা গেল দিল্লিতে বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। এর আগেও তৃণমূলের লোকসভার সাংসদেরা এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ার আগে বৈঠক করেছিলেন ভূপেন্দ্রের সঙ্গে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘দেখলাম আরও এক সাংসদ, চলচ্চিত্রশিল্পী বিজেপির এক নেতার সঙ্গে মিটিং করে পদত্যাগ করলেন। তিনি আগেই পদত্যাগের ইমেল পাঠিয়েছিলেন। এখন সশরীরে গিয়ে পদত্যাগ করেছেন।’’ এ ছাড়া রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মণীশ গুপ্তও তৃণমূল ছাড়ার ঘোষণা করেছেন। ইস্তফাপত্র তিনি পরে তৃণমূলনেত্রীকে পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন।
কোয়েলের নাম না করে তাঁর পদত্যাগের কথা উল্লেখ করেই মমতা দল ছাড়ার ‘ডেডলাইন’ বেঁধে দেন। তিনি বলেন, ‘‘এতে আমরা দুর্বল হব না’’।
আরও পড়ুন:
বুধবারের পর বৃহস্পতিবারেও মমতা বলেছেন, ‘‘যাঁরা থাকবেন, তাঁরাই সোনার খনি।’’ তাঁর পাল্টা দাবি, যাঁরা দল ছাড়ছেন, তাঁদের অনেকেই গোপনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন। তৃণমূলে ভাঙনের জন্য বিজেপির দিকে আক্রমণ বজায়ও রেখেছেন মমতা।
কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের স্থায়িত্ব নিয়েও বার বার প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘দিল্লির মদতে যা ইচ্ছা আপনারা করে যাচ্ছেন। আগে দিল্লিটা রক্ষা করুন।’’ দিল্লির আবস্থা ভাল নয় বলে কটাক্ষ করে মমতা সোনম ওয়াংচুকের অনশন প্রসঙ্গও টেনে আনেন। কেন দিল্লির সরকার সোনমের সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে যায়নি, সেই প্রশ্নও তুলেছেন।
তৃণমূল নেত্রী অভিযোগ করেন, পুলিশের ভয় বা অর্থের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে ২১শের শহিদদের পরিবারকেও। আদালতের নির্দেশ মেনে শান্তিপূর্ণ ভাবে ২১শে জুলাই শহিদ স্মরণ করার বার্তা দেন মমতা। তবে সেই সঙ্গে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকারও আর্জি তাঁর।
বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর কার্যত ভেঙেচুরে গিয়েছে মমতার তৈরি তৃণমূল। বিধায়কদের বেশির ভাগ অংশই বিদ্রোহী হয়ে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। আসল তৃণমূল তাঁরাই, এমন দাবিও করছেন। লোকসভার সাংসদদের বড় অংশ দলত্যাগ করে এনসিপিআই নামে একটি অখ্যাত দলে যোগ দিয়েছেন। দল, দলের সম্পদ নিয়ে টানাটানি গড়িয়েছে আদালতে। মমতার কালীঘাটপন্থী তৃণমূল এখন একেবারেই কোণঠাসা। এই পরিস্থিতিতে মমতার বৃহস্পতিবারের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন করে দল গড়ার যে ইঙ্গিত তাঁর মন্তব্যে রয়েছে তা ফলিত স্তরে কতটা কার্যকর হয়, তা দেখতে আগ্রহী রাজনৈতিক মহলের একাংশ।