গত বছর ২১ জুলাই এক বন্ধনীতে ফেলেছিলেন বিজেপি, সিপিএম এবং কংগ্রেসকে। বলেছিলেন, ‘‘দুই দিকে দুই কলাগাছ, মধ্যিখানে মহারাজ। জগাই-মাধাই-গদাই!’’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন মুখ্যমন্ত্রী। এক বছর পরে যখন রাজ্যপাট গিয়েছে, দল ভেঙে তিন টুকরো, তখন মরিয়া হয়ে বিরোধী জোট চাইছেন তিনি। দু’মাস ন’দিন আগে ২৫শে বৈশাখ, কালীঘাটে নিজের বাড়ির উঠোনে আয়োজিত রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে প্রথম বার বলেছিলেন। ফের বললেন মঙ্গলবার। বিড়লা তারামণ্ডলের সামনের সমাবেশে।
কী বলেছেন মমতা?
‘‘রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন বলেছিলাম যে, আসুন আমরা সারা ভারতবর্ষে ‘ইন্ডিয়া’ জোট নিয়ে লড়াই করি। বাংলাতেও করি। আমার কারও প্রতি কোনও ইগো নেই। কারও প্রতি কোনও অসন্তোষ-ক্ষোভ নেই। তা না হলে মনে রাখবেন, আজকে যাঁরা বিজেপির কথায় দলীয় অফিস খুলতে পারছেন, মিটিং-মিছিল করছেন, আমাদের শেষ করার পর ওরা আপনাদের শেষ করে দেবে।’’ এ দিন কোনও দলের নাম করেননি মমতা। তবে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন করেছিলেন। বাম, অতি বাম, কংগ্রেস—সবাইকে পাশে চেয়েছিলেন।
শুধু যাওয়া-আসা
নিজের প্রয়োজন পরিমাপ করে জোট করা বা জোট ছাড়ার ব্যাপারে মমতার জুড়ি নেই। ১৯৯৮ সালে যখন কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল গড়েছিলেন, তখন হাত ধরেছিলেন বিজেপির। কয়েক মাস আগেই বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘‘লেবার রুমে লালকৃষ্ণ আডবাণী আর অটলবিহারী বাজপেয়ী না-থাকলে কংগ্রেসের গর্ভ থেকে তৃণমূল নামক শিশুটি ভূমিষ্ঠই হত না।’’ সেই বিজেপির সঙ্গও একাধিক বার ছেড়েছেন মমতা। হাত ধরেছেন কংগ্রেসের। অটলবিহারী বাজপেয়ী, মনমোহন সিংহ—দু’জনের মন্ত্রিসভাতেই ছিলেন মমতা। তিনি কখন ইউপিএ-তে, কখন এনডিএ-তে, বোঝা দুষ্কর ছিল। ২০০১ সালে ‘হয় এ বার, নয় নেভার’ ভোটের আগে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট হয়েছিল। জোট জেতেনি, টেকেওনি। ফের এনডিএ-তে ফিরে গিয়েছেন মমতা। ২০০৪-এর লোকসভা এবং ২০০৬-এর বিধানসভা ভোটে দাগ কাটতে না-পেরে উপলব্ধি করেছেন, সিপিএম-কে সরাতে হলে রাজ্যে কংগ্রেসকেই দরকার। ২০০৯ সালে আবার জোট করেছেন কংগ্রেসের সঙ্গে। ২০১১-তে ক্ষমতায় এসেছেন। এসে দু’বছরের মধ্যেই ঝেড়ে ফেলেছেন কংগ্রেসকে। তা বলে এনডিএ-তে ফেরেননি। একাই ভোগ করেছেন ক্ষমতার সবটুকু।
আরও পড়ুন:
‘ইন্ডিয়া’র পথের কাঁটা
২০২৪-এর লোকসভা ভোটের আগে জাতীয় স্তরে বিজেপিবিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ গঠিত হয়। সংখ্যার নিরিখে সেই জোটে তৃণমূল ছিল অন্যতম বড় শক্তি। গোড়ায় মনে হচ্ছিল, জোট নিয়ে উৎসাহী মমতা। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততই যেন তাকে আর মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। রাজ্যে আসনবণ্টন নিয়ে কোনওরকম আলোচনায় যাননি জোট শরিকদের সঙ্গে। একাই প্রার্থী দিয়েছিলেন সব আসনে। এমনকি, রাজ্যে ‘ন্যায় যাত্রা’য় আসা রাহুল গাঁধীকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘‘হিন্দি বলয়ে ৪০টা আসন পাবে কি না সন্দেহ। আর এখানে এসেছে যাত্রা নিয়ে! লক্ষ্য হল মুসলিম ভোট ভাগ করা।’’ বিরোধী জোটের বৈঠকে যাওয়ার ব্যাপারেও তখন আগ্রহ ছিল না মমতার। যে বৈঠকে সনিয়া, রাহুল, অখিলেশ, শরদ পওয়ারেরা উপস্থিত, সেখানে নিজে না-গিয়ে পাঠাতেন কম ওজনের কোনও নেতাকে। এখন, ক্ষমতা এবং প্রায় গোটা দল হারানোর পরে অভিষেককে সঙ্গী করে যোগ দিয়েছেন ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে। আলাদা করে সনিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন মমতা। রাহুলের সঙ্গে অভিষেক। তবে ভাগ্যের পরিহাস এই যে, মমতা-অভিষেক যখন ইন্ডিয়া-র বৈঠকে, তখনই কয়েক কিলোমিটার দূরে মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাংলোয় বসে দল ভেঙেছেন লোকসভার তৃণমূল সাংসদেরা।
চিরদিন কাহারও...
মমতার দুর্দিনে এখন সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে করাচ্ছে বাম-কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসের রক্তক্ষরণ হয়েছে। কংগ্রেসকে তিনি ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। আজ খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইছেন। আশা করি জোট নিয়ে ভাবার আগে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন।’’ তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে শহিদ মিনারের সমাবেশ থেকে সামনের বছরের গোড়ার দিকে রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গাঁধীর উপস্থিতিতে ব্রিগেড সমাবেশেরও ডাক দিয়েছেন শুভঙ্কর। অন্য দিকে, মমতার বার্তার প্রতিক্রিয়ায় সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের কটাক্ষ, ‘‘মমতার কথায় এখন খুব একটা গুরুত্ব দেওয়ার আছে বলে মনে করছি না। ওঁর নিজের দলটাই লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে। উনি আগে ওটা সামলান।’’