দুপুরে ভাত খেয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল ছেলে। তারপর আটাশ বছর কেটেছে। ছেলে বাড়ি ফেরেনি। কত গ্রাম-শহরে ছবি নিয়ে খুঁজেছেন মা। কত দুপুর জুড়ে অপেক্ষা করে বসে থেকেছেন। ছেলে আসবে, ভাত বেড়ে দেবেন। কিন্তু ছেলে ফেরেনি। মা বৃদ্ধা হয়েছেন। ভাল করে হাঁটতে পারেন না এখন। অনেক কথাও মনে রাখতে পারেন না। তবে মাঝেমধ্যে কথায়-কথায় ছেলের কথা চলে আসে। পড়শিরা দাবি করেন, বৃদ্ধা মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘‘ছেলেটা খেয়েদেয়ে যে কোথায় গেল, এখনও এল না।’’ সেই ছেলে ফিরল মায়ের কাছে। আটাশ বছর বাদে। জলপাইগুড়িতে এমনিই ফিরে আসার গল্প শোনা গেল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অফিসে বসে। জলপাইগুড়ির ৭৩ মোড়ের বাসিন্দা হরিশ রায় ফিরে এসেছেন আটাশ বছর বাদে। তাঁর খোঁজ মিলেছিল কেরালার একটি হোমে। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা বাড়িতে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে এসেছেন সেই হারিয়েযাওয়া ছেলেকে।
ছেলে ফিরে পাওয়া মা অজবালা রায় বলেন, “ছেলেটা যে কোথায় চলে গিয়েছিল কে জানে! কত খোঁজ করেছি পাইনি। হরি বলে ডাকতাম ওকে। কত বড় হয়ে গেছে, চোখ-মুখটা একই আছে।’’ মায়ের চোখে এক থাকলেও গত আটাশ বছরে চেহারা অনেকটাই বদলে গিয়েছে বছর ছেচল্লিশের হরিশ রায়ের। বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে গিয়েছিলেন কোথায় তা-ও সঠিক বলতে পারছেন না। কথাবার্তা এখনও কিছুটা অসংলগ্ন। ঘুরতে-ঘুরতে ঠাঁই হয়েছিল কেরলের হোমে। সেখান থেকে খোঁজ আসে জলপাইগুড়ি জেলা পুলিশে। পুলিশ জানায় পরিবারকে। ছেলের মামি অনিতা রায় তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন। তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় যাতায়াতের খরচ। তা জোগাড়ে তখন জলপাইগুড়ির একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে আসে। সংগঠনের সম্পাদক সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আমরা খবর পেয়েই পরিবারটিকে যতটা পেরেছি নানা দিক থেকে সাহায্য করেছি। ছেলেটি ফিরে এসেছে এটিই বড় কথা।’’
বাড়ি ফিরে আসা হরিশ বলেন, ‘‘মায়ের কাছে ফিরতে পারলাম। তবে দেরি হল।’’ বৃদ্ধা মা অজবালা রায় বারবার তাকিয়ে দেখছিলেন ছেলের দিকে। যে ছেলে চলে গিয়েছিল হয়তো তারই ছায়া খুঁজছিলেন ফিরে আসা ছেলের মুখে-চোখে, আটাশবছর পরে।