উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার এবং ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস্ নেক’-এর নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র করতে পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় সরকারের। শুক্রবার শিলিগুড়ির রানিডাঙায় সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)-এর উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার হেডকোয়ার্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকার নতুন প্রশাসনিক, আবাসিক প্রকল্পের শিলান্যাস এবং কিছু প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেখান থেকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে খোঁচা দিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
শাহের কথায়, ‘‘সীমান্তসুরক্ষার জন্য ২০১৪ সাল থেকে ১১২৯ একর জমি চাওয়া হলেও এত দিন পাওয়া যায়নি। এমনকি, তখনকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বারবার আবেদন করেও লাভ হয়নি।’’ শাহের সংযোজন, ‘‘হাতে-পায়ে ধরে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। জমি মেলেনি।’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি বিশেষ ‘ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড’ তৈরি করেছে। চোপড়া, কিশানগঞ্জ এবং ধুবড়ি— এই তিন ঘাঁটি থেকে সমগ্র করিডরে নজরদারি, সামরিক উপস্থিতি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত ‘তিস্তা প্রহার’-এর মতো সামরিক অনুশীলনের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে। এসএসবির জওয়ানদের ভূয়সী প্রশংসা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর মণিপুর, জম্মু-কাশ্মীর, ত্রিপুরা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসএসবি জওয়ানেরা অসামান্য সেবা দিয়েছেন। কারগিল যুদ্ধের পর ‘ওয়ান বর্ডার, ওয়ান ফোর্স’ নীতি অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে ১,৭৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-নেপাল সীমান্ত এবং ২০০৪ সাল থেকে ৭০০ কিলোমিটার (প্রকৃতপক্ষে ৬৯৯ কিমি) দীর্ঘ ভারত-ভুটান সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে এসএসবি। কাঁটাতারহীন উন্মুক্ত সীমান্তে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রীতি বজায় রেখে দিবারাত্রি কাজ করা অত্যন্ত কঠিন, যা এসএসবি জওয়ানেরা নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাচ্ছেন। ‘ওয়ান বর্ডার, ওয়ান ফোর্স’ নীতি অনুযায়ী, ভারতের প্রতিটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ভাবে একটিমাত্র আধা-সামরিক বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থার ফলে সীমান্তে কমান্ডের বিভ্রান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি নজরদারি আরও জোরালো হয় বলে দাবি মোদী সরকারের।
সীমান্ত পরিকাঠামো উন্নয়ন ও জমি সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্যের পূর্বতন সরকারের সমালোচনার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন শাহ। তিনি বলেন, ‘‘শিলিগুড়ি করিডরকে শক্তিশালী করতে দীর্ঘ দিন ধরে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির প্রায় ৫৬০ একর জমির প্রয়োজন ছিল। অনুপ্রবেশ রুখতে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হলেও পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের কাছ থেকে অনুরোধ সত্ত্বেও জমি পাওয়া যায়নি। কিন্তু নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পরেই জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। রাজ্য সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ ও এসএসবির জমিজট কাটিয়ে ১,১২৯ একর জমি হস্তান্তর করেছেন। এমনকি, প্রাতরাশের আলোচনার সময় বাকি থাকা ২৯ একর জমির অনুমোদনও তৎক্ষণাৎ সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছেন।’’ তিনি এ-ও বলেন, ‘‘এসএসবির অনুষ্ঠানে বারবার মমতাজিকে আমন্ত্রণ জানাতাম। উনি আসতে চাইতেন না। আমরা শুভেন্দুকে ডেকেছি। উনি এসেছেন।’’
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পাশাপাশি যাতায়াত, পর্যটন ও অর্থনৈতিক বিকাশকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ‘ভাইব্র্যান্ট ভিলেজ প্রোগ্রাম ২.০’-এর আওতায় ৬,৮৩৯ কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং ভুটান সীমান্ত গ্রামগুলিকে কেবল সড়কপথেই নয়, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এর সঙ্গে ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি স্টেশনকে বিশ্বমানের স্টেশনে রূপান্তর করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে দিল্লি-শিলিগুড়ি হাই-স্পিড রেল করিডর চালুর মাধ্যমে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে দিল্লি থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শিলিগুড়ি পৌঁছোনো সম্ভব হবে। রানিডাঙায় এসএসবির ৮০ একর জমিতে নবনির্মিত প্রশাসনিক ভবন, ১৯তম ব্যাটালিয়ন (ঠাকুরগঞ্জ), ১২তম ব্যাটালিয়ন (কিশানগঞ্জ) এবং নিউ জলপাইগুড়ির ট্রানজ়িট ক্যাম্প চালুর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিকাঠামোর নতুন অধ্যায় শুরু হল।