শিলিগুড়ির হাসপাতালে শুক্রবারও একটুআধটু কথা বলতে পারছিলেন নিকিতা সাহা। শনিবার সেই ক্ষমতা হারিয়েছেন অনেকটাই। এমনটাই জানালেন তাঁর স্বামী, উত্তর দিনাজপুরের বাসিন্দা সৌভিক দাস। সিটঙের হোমস্টেতে বার্বিকিউয়ের আগুনে ঝলসে গিয়েছিলেন নিকিতা। ওই ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ৷ ধৃত চার জনের মধ্যে রয়েছেন হোমস্টের মালিক নেহাল আজরান। তিনি ছাড়াও হোমস্টের আর এক অংশীদার পবনকুমার অগ্রবাল, কর্মী দীপেন লামা এবং নাসির উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নাসির উদ্দিন উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বাসিন্দা। বাকি তিন জনই কার্শিয়াংয়ের৷
সিটঙের ঘটনায় সৌভিক আঙুল তুলেছেন হোমস্টে কর্তৃপক্ষের দিকে। তাঁর অভিযোগ, সময় মতো নিকিতাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনও ব্যবস্থাই করেননি তাঁরা। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। অ্যাডিশনাল এসপি (কার্শিয়াং) অনিন্দ্যসুন্দর ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ গোটা ঘটনার তদন্ত চলছে৷’’
গ্রেফতারির পরে সৌভিক বলেন, ‘‘হোমস্টে পরিচালনা নিয়ে সমস্যা রয়েছে।’’ অন্য দিকে, নিকিতা ভর্তি রয়েছেন শিলিগুড়ির হাসপাতালে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছিল, তাঁর শরীরের ৬০ শতাংশে পোড়া ক্ষত রয়েছে। সৌভিক বলেন, ‘‘শুক্রবার যে ভাবে অল্প একটু কথা বলছিল, সেটা আজ কমে এসেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, সময় লাগবে।’’ নিকিতার স্বামী জানান, শনিবার চিকিৎসকেরা বৈঠক করবেন। কিছুটা সুস্থ না হয়ে উঠলে নিকিতাকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা সম্ভব নয়। সৌভিকের কথায়, ‘‘সময় লাগুক, কিন্তু ও সুস্থ হয়ে উঠুক। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই।’’
সৌভিক এই ঘটনার জন্য হোমস্টে কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, অদক্ষ কর্মী বার্বিকিউয়ের আগুনের তাপ বাড়াতে তার মধ্যে তারপিন তেলের ড্রাম ঢেলে দেন। তার জেরে দাউদাউ করে জ্বলে উঠে আগুনের শিখা। বার্বিকিউয়ের সামনে বসে ছিলেন নিকিতা। হঠাৎ আগুনের তাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝলসে যান তিনি। সৌভিক জানিয়েছেন, তিনি নিজেও ঝলসে যান। তাঁর অভিযোগ, সেই অবস্থাতেই তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি চেয়ে অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পরেও হুঁশ ফিরছিল না হোমস্টে কর্তৃপক্ষের। প্রায় আধঘন্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পরে একটি গাড়ি মেলে বলে জানান সৌভিক। সেই গাড়িতে নিকিতাকে নিয়ে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। ওই পরিস্থিতিতে কেউই তাঁদের সঙ্গে ছিলেন না বলে অভিযোগ সৌভিকের। তিনি একাই অগ্নিদদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে শিলিগুড়ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে পৌঁছোন। ততক্ষণে নিকিতার স্বর ক্ষীণ হয়ে এসেছিল।
সৌভিকের অভিযোগ অবশ্য মানতে চাননি হোমস্টে কর্তৃপক্ষ। মালিক নেহালের দাবি, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দম্পতির সঙ্গে তৃতীয় যে ব্যক্তিকে দেখা গিয়েছে, তিনি তাঁদের কর্মচারী নন। বার বার সতর্ক করা সত্ত্বেও ওই দম্পতি আগুনের সঙ্গে সেঁটে বসেছিলেন, অভিযোগ কর্তৃপক্ষের। মালিক বলেন, ‘‘বার্বিকিউ চলছিল। তার মধ্যেই ওঁরা রাতের খাবারের অর্ডার দেন। আমাদের কর্মী তার ব্যবস্থা করতে গিয়েছিলেন। ওঁদের বার বার সতর্ক করা হয়েছিল। আগুন থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল। আমাদের কর্মী চলে যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে তৃতীয় এক জনকে ওঁরা ডাকেন এবং জানান, ঠান্ডা লাগছে। কেরোসিন ঢেলে আগুন বাড়িয়ে দিতে বলেছিলেন ওঁরা। ওই ব্যক্তি আমাদের হোটেলের কেউ নন।’’
তরুণী নাইলনের পোশাক পরেছিলেন বলে দাবি করেছেন হোমস্টে কর্তৃপক্ষ। তার ফলে আগুন আরও দ্রুত তাঁর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, দম্পতি পাশাপাশি বসে আছেন। সামনে বার্বিকিউ চলছে। উল্টো দিক থেকে একজন ড্রাম কাত করে আগুনে কিছু ঢালার চেষ্টা করেন। তখনই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে এবং তরুণী ঝলসে যান।