প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংঘাতের ফল কী হতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ মালদহের গঙ্গা। যে নদী ছিল জীবন-জীবিকার অবলম্বন, ভাঙন ও বন্যার জেরে সেই গঙ্গাই এখন বহু জনপদের কাছে আতঙ্কের নাম। নদীর বুক দখল, চর জেগে উঠলেই বসতি, নদীঘেঁষা এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ—প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথে মানুষের একের পর-এক হস্তক্ষেপই এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে। গঙ্গাকে বশে আনার চেষ্টা যত বাড়বে, নদীর প্রতিক্রিয়াও তত ভয়ঙ্কর হতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞেরা।
নদী তার গতিপথ বদলায়, পার ভাঙে, নতুন চর জাগে। কিন্তু সেই স্বাভাবিক পরিবর্তনের জায়গায় মানুষ যখন নদীর বুককে নিজের মতো করে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন বিপদ আরও জটিল হয়ে ওঠে। চর দখল করে ঘরবাড়ি তৈরি থেকে শুরু করে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের জায়গা সঙ্কুচিত করা—বছরের পর-বছর ধরে চলা এমন নানা কর্মকাণ্ড নদী ও জনজীবনের সম্পর্ককে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদদের একাংশ।
বর্ষার গঙ্গা যেন আরও ভয়ঙ্কর। কোথাও নদী পার গিলছে, কোথাও ভাঙনের মুখে বাড়ি, রাস্তা, স্কুল। মানুষ ভাবছে, বাঁধ দিয়ে, বসতি গড়ে, জমি দখল করে গঙ্গাকে নিজের মতো করে নেওয়া যাবে। আর গঙ্গা প্রতি বর্ষায় মনে করিয়ে দিচ্ছে—সে কারও সম্পত্তি নয়। তাই ভাঙন শুরু হলে প্রশাসন ছুটছে। বাঁধ, বোল্ডার, জিও ব্যাগ, ত্রাণ, পুনর্বাসন—চলছে নানা ব্যবস্থা। কিন্তু ভাঙনের পরে ক্ষত সারানোর চেষ্টার পাশাপাশি ভাঙনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কতটা?
নদীকে বাঁচানো মানে শুধু নদীর পার বাঁচানো নয়। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, চর, পার এবং জলপ্রবাহের জায়গাকে বইতে দেওয়া তার একটা অংশ। সব চেয়ে বড় প্রশ্ন— ভাঙন বিপর্যয়ের দায় কি শুধুই প্রকৃতির? নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জায়গা দখল করা, চরকে বসতিতে পরিণত করে, নদীর পারের পরিবেশকে বদলে দিয়ে মানুষ কি নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনছে না? তাই আজ গঙ্গার পারে যে সতর্কবার্তা লেখা হচ্ছে, তার অভিঘাত আরও দূরে গিয়ে পৌঁছতে পারে।