আঁকার খাতা জলে ভিজে যাচ্ছে। উল্টো দিকে বসে থাকা হোমের কত্রীকে এগোরা বছরের যমুনা (নাম পরিবর্তিত) বলছে, ‘‘আর ক’দিন থাকি না হোমে, পুজো পার করে যাই?’’ হোমের কত্রী বলছেন, ‘‘কী করা যাবে, সরকারি নির্দেশ, তোমাকে বাড়ি যেতেই হবে।’’
যমুনার বাড়ি বাংলাদেশ। বছর তিনেক আগে বাংলাদেশের কুমিল্লা থেকে মা-বাবার সঙ্গে মায়াপুরের মন্দির দেখতে যাবে বলে দালাল ধরে চেংরাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকেছিল। বিএসএফের হাতে ধরা পড়ে। তারপরে প্রথমে মায়ের সঙ্গে ছয় মাস কোচবিহার জেল পরে আরও ছয় মাস জলপাইগুড়ি জেলে থাকে। মা-বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয় বহরমপুর জেলে, যমুনাকে পাঠানো হয় জলপাইগুড়িতে শিশু-কিশোরীদের থাকার অনুভব হোমে। এখানে হারমোনিয়াম বাজাতে শিখেছে, নাচ শিখেছে, আঁকা শিখেছে। সরকারি নির্দেশে সাজা শেষ হওয়ায় মা-বাবার সঙ্গে যমুনাকে বাংলাদেশের বাড়ি পাঠানো হবে। মা-বাবা খুশি হলেও যমুনা বাড়ি ফিরতে চায় না, সে হোমে থাকবে। শনিবার সারা দুপুর কেঁদেছে। চোখের জল সরকারি নির্দেশকে ভেজাতে পারে না। সন্ধ্যায় জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনে থেকে বহরমপুর যাওয়ার ট্রেন ধরেছে যমুনা।
সারাদিন ড্রইং খাতা আকড়ে থাকে মেয়েটি, জানায় হোমের আবাসিকেরা। হোমেই আঁকার হাতেখড়ি। গান-নাচ শেখারও। অনুভব হোমের পরিচালন সমিতির অন্যতম দীপশ্রী রায় শনিবার সারা দুপুর বসেছিলেন যমুনার সঙ্গে। তিনি বলেন, “সবাই বাড়ি ফেরার কথা শুনে খুশি হয়। যমুনা কেঁদে ভাসাল।’’ সরকারি নিয়ম মেনেই বহরমপুর জেলে বন্দি মা-বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হতো যমুনার। মা-বাবাকেও যমুনা বলেছিল সে দেশে ফিরবে না। কুমিল্লার গ্রামে যমুনার বাবা সেলুনে কাজ করেন। নিজেদের বাড়ি-জমি রয়েছে। তাই মা-বাবা ফিরতে চান। যমুনার সে দিকে টান নেই। যমুনার টান ড্রইং খাতায়, হারমোনিয়ামে। হোমের কাউন্সেলর বোঝায়, বাড়ি গিয়েও ড্রইং খাতা পাবে, হারমোনিয়াম পাবে। যমুনা বলে, ‘‘সেখানে এ রকম বন্ধুরা নেই। পুজোর জামাও তো হয়েছে।’’ যমুনার কথা শুনে চোখে জল সকলেরই।
দিন কয়েক আগেই পুজোর বাজার হয়েছে হোমের সব আবাসিকের। যমুনারও হয়েছে। নতুন জামা সঙ্গে তাকে দেওয়া হয়েছে হোমের তরফে উপহারও। যমুনাও হোমকে দিয়ে গিয়েছে একটি উপহার, তারড্রইং খাতাটি।