রাজ্যে পালাবদলের পরেই গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর (জিটিএ) চিফ এগ্জিকিউটিভের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন অনীত থাপা। তার পরেই পাহাড়ের এই স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন সংস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তৈরি হয়েছিল অচলাবস্থা। তা কাটাতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উত্তরবঙ্গ সফরের মাঝেই প্রশাসক নিয়োগ করল রাজ্য সরকার৷ আইএএস স্মৃতিরঞ্জন মোহান্তিকে জিটিএ প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হল৷ নবান্ন থেকে সেই নিয়ে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা থাকার সময়ই জিটিএর দিকে আঙুল তুলেছিলেন শুভেন্দু। দুর্নীতির অভিযোগে সরবও হয়েছিলেন। এ বার সেই তদন্ত করার জন্য কমিটি গঠন করা হল। মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গ সফরের মাঝে জানিয়েছেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর সভাপতিত্বে তদন্ত হবে। আইপিএস আধিকারিক কালিয়াপ্পন জয়রমন তাঁর কার্যকরী সদস্য হিসেবে তদন্ত করবেন৷
দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ে প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ-র বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ-সহ দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠছে। জিটিএ-র অধীনে বেআইনি ভাবে ৪০০-র বেশি শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পানীয় জল সরবরাহের জন্য বরাদ্দ কেন্দ্র ও রাজ্যের ‘আম্রুত’ প্রকল্পের অর্থ অপব্যবহার এবং পাহাড়ে বিভিন্ন জনজাতির সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নের জন্য গঠিত লেপচা এবং তামাং পর্ষদ-সহ ১১টি পৃথক উন্নয়ন পর্ষদের তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও উঠেছে। ইতিপূর্বে কলকাতা হাইকোর্টেও জিটিএর এই অনিয়ম এবং নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে একাধিক জনস্বার্থ মামলা হয়েছে। সিবিআই তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন:
মঙ্গলবার উত্তরকন্যা থেকে কালিম্পঙের প্রশাসনিক বৈঠকে জিটিএ-র আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকারি তহবিল ও জনগণের অর্থ যারা বেআইনি ভাবে আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং আত্মসাৎ করা অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হবে। তাঁর কথায়, ‘‘জিটিএ-তে যে সমস্ত দুর্নীতি হয়েছে, তার কোনওটাই আমরা ছাড়ব না।’’
তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে বলে জানান শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্তের জন্য কমিটি গঠিত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর সভাপতিত্বে এবং আইপিএস আধিকারিক কালিয়াপ্পন জয়রমন তাঁর কার্যকরী সদস্য হিসেবে কাজ করছেন— তাঁরা দু’জনে ইতিমধ্যেই পাহাড় ও উত্তরবঙ্গের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে পরিদর্শনের কাজ শেষ করেছেন।’’ পাহাড়ের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে কালিম্পং অঞ্চলের বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কালিম্পঙের জনগণকে আমি আশ্বস্ত করতে চাই, জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে আপনাদের পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার অমৃত প্রকল্প, যত দুর্নীতি এরা করেছে এবং আমাদের লেপচা বোর্ড ও তামাং বোর্ড-সহ যে ১১টি উন্নয়ন পর্ষদের টাকা এরা লুট করেছে, তার একজনকেও ছেড়ে দেওয়া হবে না। আপনারা দেখে নেবেন!’’
আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন, ‘‘তদন্তপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই এফআইআর দায়ের করা হবে, (দোষীদের) গ্রেফতার করা হবে এবং তাঁদের কাছ থেকে টাকা আদায়ও করা হবে।’’ তিনি এ-ও বলেন, ‘‘জনগণের যত টাকা এবং সরকারের তহবিলের যত সম্পদ এরা লুট করেছে, তা উসুল বা ফেরত নেওয়ার কাজ সরকার করবে— এই আশ্বাসও আমি দিচ্ছি।’’
২০১১ সালে রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তার পর থেকেই রাজ্য সরকারের অধীনে স্বশাসিত সংস্থা হিসাবে জিটিএ পাহাড়ের পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা-সহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করছে। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলের পরিবর্তে এই স্বশাসিত সংস্থা ২০১১ সাল থেকে কাজ করা শুরু করে। জিটিএ-র প্রশাসনিক এলাকা মূলত দার্জিলিং এবং কালিম্পং জেলার বিভিন্ন মহকুমা ও অঞ্চল নিয়ে গঠিত। জিটিএ-র হাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, এবং পূর্ত-সহ প্রায় ৫৯টি বিভাগের প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে। সেই জিটিএ-র বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।