সরকার পরিবর্তন হলেও কোনও বদল আসেনি আলিপুরদুয়ারের বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনে। কাজ নেই, নিয়মিত আয় নেই। কোথাও আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছে বিশেষ ভাতা (ফাউলাই)। তার উপরে বন্ধ চা বাগানের ঝোপঝাড়ে চিতাবাঘ, হাতি, বিষধর সাপ-সহ নানা বন্যপ্রাণীর আনাগোনা। এক দিকে অন্নের চিন্তা, অন্য দিকে বন্যপ্রাণীর হামলার আশঙ্কা—সাঁড়াশি চাপে দিন কাটছে বান্দাপানি, লঙ্কাপাড়া ও রামঝরা চা বাগানের শ্রমিকদের।
আলিপুরদুয়ার জেলায় মোট ৬৮টি চা বাগান রয়েছে। তার মধ্যে চারটি সরকারি ভাবে স্বীকৃত নয়। বাকি ৬৪টি বাগানের মধ্যে বর্তমানে তিনটি বন্ধ—রামঝরা, বান্দাপানি এবং লঙ্কাপাড়া। এর মধ্যে ২০২৪ সাল থেকে বন্ধ বান্দাপানি চা বাগান। শ্রমিকদের অভিযোগ, সরকারি খাতায় বাগানটি ‘খোলা’ দেখানো হওয়ায় তাঁরা ফাউলাই পাচ্ছেন না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সঙ্কটে দিন কাটছে তাঁদের।
অন্য দিকে, রামঝরা ও লঙ্কাপাড়া চা বাগানের শ্রমিকদেরও গত আর্থিক বছর থেকে ফাউলাই বন্ধ। বাগান কবে খুলবে, আদৌ খুলবে কি না—তা নিয়েও স্পষ্ট কোনও আশ্বাস নেই। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় শ্রমিকেরা।
লঙ্কাপাড়া চা বাগানে এক সময়ে প্রায় ২,২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে বাগানের পরিকাঠামোরও বেহাল দশা। ট্রেড ইউনিয়ন নেতা উত্তম সাহার কথায়, ‘‘শ্রমিকদের অবস্থা খুব খারাপ। ফ্যাক্টরি, বাংলো—কিছুই নেই। বাগান বন্ধ হওয়ার পরে অনেকে কাজের খোঁজে ভিন্ রাজ্যে চলে গিয়েছেন।’’
শ্রমিকদের অভিযোগ, বাগান খোলার বিষয়ে একাধিক বার বৈঠক ডাকা হলেও মালিকপক্ষের তরফে কেউ উপস্থিত হননি। এক শ্রমিকের কথায়, ‘‘ইউনিয়নের তরফে শ্রম দফতরে একাধিক বার বাগান খোলার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনও কাজ হয়নি। রাজ্যে এখন ডাবল ইঞ্জিনের সরকার। সরকার চাইলে ভাল মালিকের হাতে বাগান তুলে দিয়ে তা ফের চালু করতে পারে।’’
রামঝরা চা বাগানের এক শ্রমিকের ক্ষোভ, ‘‘বাগান খোলার আশায় সরকার পরিবর্তন করেছি। কিন্তু আমাদের কোনও লাভ হল না। যে আশা নিয়ে ভোট দিয়েছিলাম, সেই আশাতেই রয়ে গেলাম। এক দিকে অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাচ্ছি না, অন্য দিকে চা বাগান বন্ধ। কয়েক মাস ধরে ফাউলাইও বন্ধ। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ওষুধ কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারছি না।’’
রামঝরা চা বাগানের বাগানকর্মী গণপথ ওরাওঁ বলেন, ‘‘প্রায় ছ’মাস ধরে ফাউলাই পাচ্ছি না। অনেকেরই সমস্যা হচ্ছে। এক দিকে বাগান বন্ধ, অন্য দিকে ফাউলাই নেই। কী ভাবে সংসার চলবে বুঝতে পারছি না।’’
বন্ধ চা বাগানগুলিতে আর্থিক সঙ্কটের পাশাপাশি নতুন করে বাড়ছে বন্যপ্রাণীর আতঙ্কও। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আনাগোনা কম থাকায় ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়েছে বাগানের বিস্তীর্ণ এলাকা। সেই জায়গাকেই নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে বেছে নিচ্ছে চিতাবাঘ, হাতি, বিষধর সাপ-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। ফলে কাজের অভাবে ঘরে বসে থাকা শ্রমিকদেরও প্রতিনিয়ত বুনো জন্তুর হামলার আশঙ্কা নিয়ে চলতে হচ্ছে।
তবে শ্রম দফতরের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের তথ্য পাঠানো হয়েছে। পুজোর আগেই তাঁরা ফাউলাই পেতে পারেন বলে জানানো হয়েছে।
বিটিডব্লিউ সেন্ট্রাল কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট কিশোর বিশ্বশর্মা বলেন, ‘‘সরকারের কাছে থাকা পুরনো তথ্য বাতিল করে নতুন তথ্য পাঠানো হয়েছে। সকল শ্রমিকই তাঁদের ফাউলাই পাবেন।’’
সরকারি আশ্বাস মিললেও কবে বাগান খুলবে, কবে ফের কাজে ফিরবেন শ্রমিকেরা—তার উত্তর এখনও অধরা। ফলে এক দিকে বন্ধ বাগান, অন্য দিকে ভাতা বন্ধ এবং তার সঙ্গে বন্যপ্রাণীর আতঙ্ক—এই তিন সমস্যার মধ্যে পড়ে কার্যত দিশাহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন আলিপুরদুয়ারের তিন বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকেরা।