জল বিদ্যুৎ প্রকল্প, রেল লাইন, সড়ক, বড়-বড় হোটেল, বহুতল এ সব গড়তে গিয়ে পাহাড়ের অনেক ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ। বস্তুত, হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি ঠিক কতটা বিপজ্জনক হয়ে রয়েছে তা কেউ জানেন না বলে দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নিয়ে অবিলম্বে গবেষণাহওয়া উচিত।
কারণ তাঁদের কথায়, হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল ভঙ্গুর প্রকৃতির। এখানকার পাহাড়ের পাথরের স্লেট, ফিলিট জাতীয়। জল পেলে যার ভাঙার প্রবণতা বাড়ে। নিস প্রকৃতির এই পাথর ভঙ্গুর। এই অঞ্চলে পাহাড়ে পাথরে মাইকাজাতীয় খনিজও রয়েছে। তার কারণেও পাহাড়ের পাথরের ভঙ্গুর হওয়ার প্রবণতা বেশি। এখন এই পাহাড় কেটে চলছে উন্নয়নের নানা কর্মকাণ্ড। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এই পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়নের জন্য পাহাড় কেটে যাই করা হোক তার কুফল কিন্তু ভুগতে হবে। নেপালের হড়পা বানের প্রলয় সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
তিস্তা-সহ কয়েকটি নদীতে বহু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে পাহাড়ে। সিকিমের অংশে ছোটবড় ১৫টির বেশি প্রকল্প রয়েছে। এ রাজ্যের অংশেও রয়েছে অনেকগুলি প্রকল্প। এগুলি তৈরির সময় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাহাড় কাটা, গাছ কাটায় পরিবেশের উপরে বড় প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ। নদীর স্বাভাবিক গতি অবরুদ্ধ হয়েছে। পাহাড়ের উপরে বাঁধ বানিয়ে বিপুল পরিমাণ জল ধরে রাখা হচ্ছে। তার চাপ ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতে হ্রদে জলোচ্ছ্বাস বা হিমবাহ বিস্ফোরণ ভয়াবহ বিপদ ঘটাতে অনুঘটকের কাজ করবে। জলের তীব্র স্রোতে বড়-বড় পাথর এসে বাধে ধাক্কা মারলে তার পরিণতি ভয়ঙ্কর হবে।
২০২৩ সালে ৪ অক্টোবর লোনাক হ্রদে জলোচ্ছ্বাস, হড়পা বানে পাহাড়ে এবং সমতলে বিপর্যয় ঘটেছিল। বাধ ভেঙে, ঘরবাড়ি, সড়ক, সেনা ছাউনি ভেসে গিয়েছিল। গত বছর ফের পাহাড়ে ধস, হড়পা বানে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। তাবাকোশির মতো গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শিলিগুড়ি থেকে সিকিমগামী ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের বহু জায়গা ধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বিপন্ন সড়ক সংস্কার করতে ফের পাহাড় কাটতে হবে। বিপদ বাড়বে তাতেও। সম্প্রতি সিকিম রংপো রেল লাইনে সুড়ঙ্গে ধসে মারা গিয়েছেন বহু শ্রমিক। এই রেল পথ নানা প্রয়োজনে গড়ে তোলার কথা বলা হলেও তার জেরে পাহাড়ের ক্ষতি হল বলে বিশেষজ্ঞরামনে করছেন।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রধান অরিন্দম বসাকের কথায়, ‘‘রেল লাইনের জন্য পাহাড়ে সুড়ঙ্গ কাটায় ক্ষতি তো হয়েছেই।’’ তাঁর সংযোজন, পাহাড়ের পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক হয়ে রয়েছে তার উপর কোনও গবেষণা নেই। অবিলম্বে তা হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক দীপক মণ্ডলের কথায়, ‘‘পাহাড়ে জনসংখ্যা বাড়ছে। তার জেরে বহু নির্মাণ কাজ হচ্ছে পাহাড়ের ঢালে। সে সব করার সময়ে যথাযথ ভাবে মাটি-পরীক্ষা, পরিস্থিতি বিচার কিছুই হচ্ছে কি? ভুমিকম্প প্রবণ এলাকা এটি। সেটাভুললে চলবে না।’’