পুরনো রীতি মেনে আজও দশমীর দিন দেবীকে পান্তা ভাত ও চ্যাং মাছ পোড়া দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রীতিই চলে আসছে ভরাঙ্গী গ্রামের হাজরা বাড়ির দুর্গাপুজোয়। ইলামবাজারের জয়দেব কেঁদুলি পঞ্চায়েতের অন্তর্গত অজয় নদ তীরবর্তী ছোট্ট গ্রাম ভরাঙ্গী। সেখানেই হাজরা পরিবারের দুর্গাপুজো ঘিরে আজও উন্মাদনার শেষ নেই গ্রামবাসীর।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পুজোর নেপথ্যে রয়েছে এক ইতিহাস। সেই সময় বর্ধমানের রাজা ছিলেন বিজয়চাঁদ মহতাব, চারদিকে তখন বর্গিদের আক্রমণ চলছিল। খবর আসে, বর্গিরা বর্ধমানের গড় জঙ্গলের রাজবাড়ি আক্রমণ চালাতে পারে। ভাল লাঠিয়াল ও ঘোড়সওয়ার হিসেবে সে সময় জয়দেব অঞ্চলের পাড়হাট গ্রামের বাসিন্দা কন্দর্প হাজরার যথেষ্ট নামডাক ছিল। তখন বর্ধমানের রাজা কন্দর্পের কাছে সাহায্য চাইলে কন্দর্প বর্গিদের আটকাতে রাজবাড়ি চত্বরে লোক খাওয়ানো ও বেশ কিছু ঘোড়ায় করে রাজবাড়ি প্রদক্ষিণের কৌশল নিয়েছিলেন। এত লোক দেখেই বর্গিরা রাজবাড়ি আক্রমণ না করে পালিয়ে যায়। এরপর বর্ধমানের রাজা খুশি হয়ে কন্দর্প হাজরাকে ৭৮ বিঘে জমি দান করেন।
কন্দর্প পাড়হাট গ্রামে প্রথম মূর্তি তৈরি করে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তারপর ধীরে ধীরে অজয় নদের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় গ্রামটি, সমস্ত জমি বালি চাপা পড়ে যায়। তারপর সেই পুজো নিয়ে আসা হয় অজয় নদ লাগোয়া ভরাঙ্গী গ্রামে। সেই থেকে পুজো চালিয়ে হাজরা সম্প্রদায়। ইদানীং হাজরা পরিবারেরই দু’টি পুজো হয়— বড় বাড়ির পুজো ও ছোট বাড়ির পুজো। দুটো পুজোই এখন কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।
বড় বাড়ির পুজোর দায়িত্বে থাকেন বামাপদ হাজরা আর ছোট বাড়ির পুজো শ্রীদাম হাজরার দায়িত্বে। স্থায়ী মন্দিরেই দেবীর পুজো হয়। পূর্বের আচার-অনুষ্ঠান মেনে এখনও একই ভাবে এখানে পূজিত হচ্ছেন দেবী দুর্গা। তবে বিসর্জনের সময় লোকবলের অভাবে বেশ কয়েক বছর হল দেবীমূর্তির উচ্চতা আগের থেকে ছোট করা হয়েছে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিনদিনই এখানে বলিদান প্রথা পালিত হয়। পুজোর আর একটি বৈশিষ্ট্য, দশমীতে পান্তা ভাত ও চ্যাং মাছ পোড়ার ভোগ নিবেদন করা হয় দেবীকে। এই বিশেষ ভোগ দেখতে জনসমাগম হয়।
হাজরা পরিবারে সদস্য দেবু হাজরা বলেন, “এই পুজো পূর্বপুরুষের আমল থেকে চলে আসছে। আগে যে ভাবে পুজো হত, এখনও সে ভাবেই পুজো হয়। আমাদের সাধ্যমতো পুজো চালিয়ে যাচ্ছি। বহু মানুষ পুজো দেখতে ভিড় জমান।”