আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস ৩০ জুলাই। তবে অঞ্চলভেদে তারিখ বদলায়। ভারতে যেমন ১ অগস্ট পালিত হয় বন্ধুত্ব দিবস। তবে পশ্চিমবঙ্গের দুই জেলার দুই বিধানসভায় পৃথক বন্ধুত্ব দিবসের ‘সূচনা’ করলেন মুখ্যমন্ত্রী। শুক্রবার নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে উপনির্বাচনে জয়ের পর ৬ অক্টোবরকে (ভোটগ্রহণের দিন) ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’ বলে উল্লেখ করলেন শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার ‘বন্ধুত্ব দিবসের’ শুভেচ্ছা জানিয়ে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরবাসীকে করজোড়ে প্রণাম জানালেন। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামবাসীকে জানালেন ভালবাসা।
রেজিনগরে সংখ্যালঘু ভোটার ৭৪ শতাংশ। বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার পেয়েছেন প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোট। নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ পেয়েছেন ৭৬ শতাংশ ভোট। সেখানে সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন ৩০ শতাংশেরও সামান্য বেশি। ভোটের ফলাফলে পরিষ্কার, সংখ্যালঘুরাও বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। দুই বিধানসভায় পদ্মের বিজয় মিছিলে আবির মেখে যে কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখা গেল, তাতে অধিকাংশই সংখ্যালঘু মুখ। যদিও বিরোধীদের দাবি, ভোট লুট হয়েছে।
নন্দীগ্রাম শুভেন্দুর চেনা ময়দান। পর পর তিন বার তাঁকে সেখানকার মানুষ বিধানসভায় পাঠিয়েছেন। তাই উপনির্বাচনে বিজেপির ‘বড় ফল’ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তবে আলাদা করে চ্যালেঞ্জ ছিল সংখ্যালঘু ভোট টানা। ভোটপ্রচারেও তা পরিষ্কার ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘সংখ্যালঘুদের কাছে আবেদন, বড় সুযোগ আছে, আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার।’’ সেই ‘সুযোগ’ গ্রহণ করলেন সংখ্যালঘুরা। শুভেন্দুর ছেড়ে দেওয়া আসনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি জিতলেন লক্ষাধিক ভোটে। একই ভাবে গত বিধানসভা ভোটে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির ৫৮ হাজারের বেশি ভোটে জেতা রেজিনগরও বিজেপি ছিনিয়ে নিল ৭৫ হাজারেরও বেশি ভোটে। রেজিনগর নিয়ে তাই আলাদা করে আপ্লুত শুভেন্দু।
রেজিনগরের ফল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নিজস্ব মূল্যায়ন, সংখ্যালঘু যে মহিলারা অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার টাকা করে পেয়েছেন, তাঁরা সপরিবার শাসকদলকে ভোট দিয়েছেন। নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের প্রায় ৭০ হাজার অন্নপূর্ণা প্রাপক মহিলারা সপরিবার বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। এটা জয়ের বড় কারণ।’’
দুই উপনির্বাচনের ফল বিজেপির জন্য আশাপ্রদ তো বটেই। মনে করা হচ্ছে, পুজোর পর রাজ্যের পুরসভা ভোটেও শাসকদলকে বাড়তি অক্সিজেন দেবে এই ফল। আপ্লুত শুভেন্দুর নবান্ন থেকে মন্তব্য, ‘‘রেজিনগর যেতে পারিনি আজ। কমিটমেন্ট ছিল যাব। তবে নির্বাচন বিধি থাকার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করিনি। আমি এখান থেকেই সমস্ত ভোটারকে প্রণাম করছি।’’ তিনি বলেন, ‘‘প্রতিশ্রতিমাফিক নারকেলবেড়িয়া ব্রিজ়, সরকারি হাসপাতাল ২০০ শয্যায় উন্নীত করা, রেজিনগর শিল্পতালুকে দু’-তিন বছরে শিল্পস্থাপন— আমূলের মিল্ক কালেকশন সেন্টার ইত্যাদি দিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণ করব।’’ বিধানসভায় বিজেপির সদস্য সংখ্যা ২০৭ থেকে ২০৯-এ পৌঁছে দেওয়ায় দুই কেন্দ্রের ভোটারদের ‘বন্ধুত্ব দিবস’-এর শুভেচ্ছা জানান তিনি।
নন্দীগ্রামের ফলাফল
বিধানসভা নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের পাশাপাশি কলকাতার ভবানীপুরের প্রার্থী ছিলেন শুভেন্দু। দুই কেন্দ্রেই জয়ী হন। পরে ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেন। নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর জয়ের ব্যবধান ছিল ৯,৬৬৫। উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর প্রচারে শুভেন্দু সংখ্যালঘু ভোটারদের বিশেষ বার্তা দেন। তিনি জানান, এটা তাঁদের কাছে বড় সুযোগ। তিনি বন্ধুত্বের হাত বাড়াচ্ছেন। হাত ধরলে সরকারের উন্নয়ন-রথে সওয়ার হবেন সকলে। গত ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে ভোট দিতে যান মুখ্যমন্ত্রী। ভোটদানের ছবি দেখে বলেছিলেন, ‘‘৯ অক্টোবর মনের কথা জানা যাবে। তবে সংখ্যালঘুরা যে ভাবে উৎসাহ দেখাচ্ছেন, তাতে আমাদের মার্জিন অনেকটাই বাড়বে।’’
শুভেন্দুর ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গিয়েছে। ভোটগণনায় একটার পর একটা রাউন্ড গিয়েছে, হাসিরানির হাসি চওড়া হয়েছে। ১৫তম রাউন্ডে গণনা শেষ হলে দেখা যায়, ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩ ভোটে জয়ী বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি। দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেসের মিলন প্রধান। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৪১ হাজার ৬৭৪। তৃতীয় স্থানে বামেদের (সিপিআই) শান্তিগোপাল গিরি। পেয়েছেন ৫,৭৮৯ ভোট। ঋতব্রতপন্থী বা গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী এহেতাশমুল হকের ঝুলিতে পড়েছে ৮৫৩টি ভোট। তাঁর বেশি ভোট পেয়েছেন আইএসএফের সবেমিরাজ আলি খান। ১,৬০৭। নোটায় ভোটদানের সংখ্যা ৬৪৩। বিজয়ী প্রার্থী হাসিরানি বলেন, ‘‘এই জয় নন্দীগ্রামবাসীর জয়, এই জয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জয়।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘এত দিন সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করা হত। সংখ্যালঘুরাও তাঁদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।’’
নন্দীগ্রামের বিরোধীরা
গণণার মাঝপথে গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান নন্দীগ্রামের আইএসএফ প্রার্থী সবেমিরাজ। তাঁর বক্তব্য, ‘‘শাসকদল রাষ্ট্র ক্ষমতাকে প্রয়োগ করে ভোট করিয়ে নিয়েছে। তাই ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।’’ গণনাকেন্দ্রের আশপাশে ঋতব্রতের প্রার্থী এহেতাশমুলকে দেখাই যায়নি। আর এ বারের ‘আলোচিত’ কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের বক্তব্য, ‘‘ভোট তো লুট হয়েছে। যেখানে অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে, সেখানে আমরা ভাল ভোট পেয়েছি। অধিকাংশ বুথের ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। আর যেখানে মুখ্যমন্ত্রী ভোটের মার্জিন বেঁধে দেন, সেখানে ফলাফল কী হবে তা সকলেরই জানা। সেটাই হয়েছে।’’ সিপিআইয়ের শান্তিগোপাল দাবি করেছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে তিনি আরও বেশি ভোট পেতেন।
রেজিনগরেও ফুটল পদ্ম
গত বিধানসভা ভোটে বিজেপির বাপন ঘোষকে ৫৮ হাজারেরও বেশি ভোটে হারিয়েছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর। ৫১.৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু হুমায়ুনের পুত্র গোলাম নবি আজ়াদ উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ভোটই পেয়েছেন ৫৪ হাজারের কিছু বেশি। বিজয়ী শাখারভ পেয়েছেন ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৯১৪টি ভোট। জয়ের ব্যবধান ৭৫৮১৬।
২০২১ সালে রেজিনগর জেতা রবিউল আলম চৌধুরী মমতা তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে পেয়েছেন মাত্র ৩,৮৩৭ ভোট। গণতান্ত্রিক তৃণমূলের শফিউজ্জামান শেখ পেয়েছেন ২,০৪৪ ভোট। রেজিনগরে পদ্ম ফুটিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীকে জয় উৎসর্গ করেছেন শাখারভ। অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘রাজ্যে এখন ভয়মুক্ত, ভরসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে... বাংলার মানুষ আর পচা শামুকে পা কাটতে চান না।’’ তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন শাসকদল বিজেপির নামে মিথ্যাচার করত। সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানো হত এই বলে যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের বাংলাদেশ চলে যেতে হবে। ডিটেনশন সেন্টারে থাকতে হবে। এ বার সেই সব মিথ্যা প্রমাণিত করেছেন সংখ্যালঘুরাই। আগামিদিনে রেজিনগরের জন্য উন্নয়নের ডালি পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
রেজিনগরের বিরোধীরা
ফল নিয়ে কোনও প্রার্থীর এমন উদাসীনতা হয়তো এর আগে দেখা যায়নি, শুক্রবার যেটা দেখালেন শফিউজ্জামান ওরফে হাবিব মাস্টার। গণনা শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই যিনি বাড়ির পথ ধরেন। জানান, বড্ড ঘুম পেয়েছে। মানুষ যে তাঁকে ‘জ়িরো’ করেনি, তাতেই সন্তুষ্ট। মমতার তৃণমূল এবং কংগ্রেস আগেই পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। তাদের দাবি, ভোট স্রেফ লুট হয়ে গিয়েছে। আর রেজিনগর হাতছাড়া হওয়ার পর হুমায়ুন জানিয়েছেন, তিনি দেশ ছাড়বেন! বিজেপি এবং রাজ্য সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলে দেন, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ হয়েছে। মানুষ ভোট দিতেই পারেনি। রাজনীতি থেকে অবসরের কথা দু’দিন আগে বলেছিলেন। ফলের দিন জানালেন, জীবনের বাকি দিনগুলো দুবাইয়ে কাটাবেন। অন্য দিকে, হুমায়ুন প্রসঙ্গে শুক্রবার শুভেন্দুর বক্তব্য, যত দিন তিনি বিধায়ক পদে রয়েছেন, তত দিন তিনি বিধানসভার সহকর্মী। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “উনিও আমার কলিগ, বিধানসভার বিধায়ক। যতক্ষণ নওদার বিধায়ক রয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কলিগ। আমি কেন তাঁকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করব?’’
প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছাবার্তা
নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর জয়ের পর সমাজমাধ্যমে দলীয় কর্মী-সমর্থক তথা আমজনতাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি জানান, এই ক্রমাগত আশীর্বাদের জন্য তিনি আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ। নগাঁও (অসম)-এর লোকসভার পাশাপাশি নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের ফলাফল এনডিএ তথা বিজেপির সুশাসন এজেন্ডার সঙ্গে জনগণের আত্মিক যোগাযোগের বড় প্রমাণ বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরও লেখেন, ‘‘জনগণের কল্যাণ সাধনে এবং একটি উজ্জ্বল, সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমরা যে ক্লান্তিহীন কাজ করে চলেছি, এই রায় সেই প্রচেষ্টায় আরও শক্তি জোগাবে।’’