মরণোত্তর দেহদানকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ আখ্যা দিয়ে অঙ্গদানের গুরুত্ব বৃদ্ধির সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। দেহদান নিয়ে নিজের বক্তব্যের সপক্ষে টেনে এনেছেন জ্যোতি বসুর দেহদানের প্রসঙ্গও। বিজেপি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মত শুনে বিস্ময় প্রকাশ করছেন চিকিৎসা এবং দেহদান আন্দোলনে যুক্ত অনেকেই।
চক্ষুদান সংক্রান্ত সচেতনতা প্রচারের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার নিউটাউনে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন শারদ্বত। মন্ত্রী নিজেও একজন চিকিৎসক। সেই মঞ্চ থেকেই শারদ্বত বলেন, ‘‘দেহদান করে লাভ নেই! পশ্চিমবঙ্গের উৎসাহী বাঙালি বলে, পুরো বডিটাই দান করে দিয়েছি ডাক্তারবাবু। আমি বলছি, ওটা করবেন না প্লিজ়।’’ তাঁর মতে, দেহদানের পরিবর্তে অঙ্গদান অনেক বেশি জরুরি।
অঙ্গদান যে একটি জরুরি বিষয় তাতে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করছেন না। দেহদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমাজকর্মীদের বক্তব্য, দেহদানের সঙ্গে অঙ্গদানের তুলনা চলে না। দু’ধরনের দানের দর্শন কখনওই এক নয়। এ রাজ্যে দেহদান নিয়ে মানুষকে সচেতন করা শুরু করেছিল গণদর্পণ সংগঠন। প্রতিষ্ঠাতা তথা মূল সংগঠক ব্রজ রায় এখন প্রয়াত। কিন্তু গণদর্পণের কাজ থেমে যায়নি। সংগঠনের সম্পাদক সুদীপ্ত সাহা রায়ের কথায়, ‘‘অঙ্গদানের যেমন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তেমন মরণোত্তর দেহদানেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি মেডিক্যাল কলেজেই প্রতি বছর চিকিৎসক পড়ুয়াদের পড়ানোর জন্য ১০ থেকে ১৪টি দেহের প্রয়োজন হয়। কর্মশালার জন্যও প্রায় সময়ই মেডিক্যাল কলেজগুলি থেকে মরণোত্তর দেহের খোঁজ করা হয়। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে সেই চাহিদা আরও বেশি।’’ এ রাজ্যে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ২৪। বেসরকারি কলেজ ২৬টি। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের হিসাবে ১০ জন ছাত্রপিছু একটি মৃতদেহ প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:
দেহদান আন্দোলনে যুক্ত কর্মীরা বলছেন, দেহদান যে কেউ করতে পারেন। অন্য দিকে, দুর্ঘটনাজনিত কারণ বা শারীরিক অসুস্থতার নিরিখে কারও মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট রোগীর পরিজনদের অঙ্গদানের জন্য বোঝানো হয়। অঙ্গদান মরণোত্তর নয়। মস্তিষ্কের মৃত্যু হওয়ার পর হৃৎপিণ্ড থেমে যাওয়ার আগে অঙ্গদান করতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে যে কাজ করে রোটো (রিজিওনাল অর্গান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজ়েশন)। অঙ্গদানে মানুষের প্রাণ বাঁচে। দেহদানে উপকৃত হন চিকিৎসক পড়ুয়ারা। সেবা ভাব থেকে তৈরি হওয়া দুই ধরনের দানের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। কিন্তু দুটোর প্রয়োজন ভিন্ন। দেহদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমাজকর্মীরা বলছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে অহেতুক সেই বিরোধ তৈরিরই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উল্টে তামিলনাড়ুর মতো বাংলাতেও মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘোষণা কেন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছেন তাঁরা। গণদর্পণের সম্পাদকের কথায়, ‘‘কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার ভাবধারা থেকে মরণোত্তর দেহদানের আন্দোলন। সুতরাং মরণোত্তর দেহদান করবেন না এটা বলা সমীচীন নয়।’’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দর্শন অবশ্য ভিন্ন। অঙ্গদানের জয়গান প্রসঙ্গে বৈদিক শান্তিমন্ত্র ‘অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়’-এর উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ হল অন্ধকার থেকে আলো বা জ্ঞানের পথে এগিয়ে যাওয়া! মরণোত্তর দেহদানে চিকিৎসক পড়ুয়ারা যে উপকৃত হন সেই প্রসঙ্গে শারদ্বত বলছেন, ‘‘আজকাল দেহ ব্যবচ্ছেদেরও দরকার নেই। আমেরিকায় মৃতদেহের ব্যবচ্ছেদের উপরে ফুলস্টপ পড়ে গিয়েছে।’’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলির অ্যানাটমি বা শারীরবিদ্যার চিকিৎসকদের অনেকেই। প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএসের প্রথম সেমেস্টারে পড়ুয়াদের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে অ্যানাটমি পড়ানো হয়। এসএসকেএমের অ্যানাটমি বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, ‘‘দেহ ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজন না-থাকলে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন প্রতি ১০ জন পড়ুয়া পিছু ব্যবচ্ছেদের জন্য একটি মৃতদেহ কেন বাধ্যতামূলক করেছে। তা হলে তো বলতে হয় ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন ভুল পথে হাঁটছে! দেহ ব্যবচ্ছেদের পরিবর্তে ভার্চুয়াল বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যবচ্ছেদকে সেখানেই স্বাগত জানানো হয়েছে যেখানে দেহদানের মানসিকতা নেই। আমাদের রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে মরণোত্তর দেহদানের মানসিকতা রয়েছে।’’
অ্যানাটমির বর্ষীয়ান চিকিৎসক শিবশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘চিকিৎসাবিদ্যা সম্পূর্ণ হতে পারে না অ্যানাটমি ছাড়া। আর অ্যানাটমির শিক্ষা সম্পূর্ণ হতে পারে না শবদেহের ব্যবচ্ছেদ ছাড়া। অঙ্গদানের প্রয়োজন আছে, দেহদানেরও প্রয়োজন আছে। এ রাজ্যের কোথাও এআই কাজে লাগিয়ে ব্যবচ্ছেদ হয় বলে আমার জানা নেই।’’
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে থেকে এমবিবিএসে স্নাতক হয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেখানকারই অ্যানাটমির প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান কল্যাণ ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘ভার্চুয়ালি ব্যবচ্ছেদ থেকে সবটা জানা যায় না। মানদদেহের প্রতিটি অঙ্গ কী ভাবে রয়েছে, কোন হাড়ের কী অবস্থান, কোনটি কোন স্তরে রয়েছে, কত গভীরে একেকটি অঙ্গের অবস্থান, কোথায় কী ধরনের শিরা, ধমনী রয়েছে, থ্রি ডি ইমেজ দেখে তা বোঝা সম্ভব নয়। একজন ভাল চিকিৎসক হতে হলে নিজের হাতে দেহ ব্যবচ্ছেদ করেই ডাক্তারি শিখতে হয়। ভার্চুয়াল ব্যবচ্ছেদ এতই উন্নতমানের হলে অর্থোপেডিকের চিকিৎসকেরা কেন এখনও অ্যানাটমি বিভাগে এসে হাঁটু প্রতিস্থাপনের কর্মশালা করেন। ইএনটি-র চিকিৎসকেরাও মৃতদেহ থেকেই কানের অস্ত্রোপচারের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি শেখেন।’
শুধু মরণোত্তর দেহের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘‘জ্যোতি বসুর দেহ যে দান করা হয়েছিল তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে লাগেনি। আরও কাজে লাগত যখন ওঁর (জ্যোতি বসু) ব্রেন ডেথ হয়েছিল তখন যদি অঙ্গদান করা হত।’’ এই কথা শুনে জ্যোতি বসু সমাজচর্চা ও গবেষণা কেন্দ্রের সম্পাদক তথা সিপিএম নেতা রবীন দেবের প্রতিক্রিয়া, ‘‘শারদ্বত মুখোপাধ্যায় একজন চিকিৎসক। চিকিৎসাবিদ্যায় নিশ্চয় ওঁর জ্ঞান অনেক বেশি। কিন্তু বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীলতা এবং আরএসএসের সমর্থক হওয়ার মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল। কোভিডের সময় থালা বাজানোর মধ্যেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে। এ ধরনের মন্তব্য করার আগে দেহদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমাজসৈনিকদের কথা বলতে পারতেন। বিজেপি, আরএসএস যা কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক তার বিরোধিতা করবে এর মধ্যে অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু জ্যোতি বসুকে এখানে টেনে আনা হল সেটা বেদনাদায়ক। একজন মৃত ব্যক্তিকে ঘিরে এ ধরনের মন্তব্য না করলেই ভাল।’’