মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁচল ছেড়েছেন অনুব্রত মণ্ডল। ঋতব্রত শিবিরে যোগ দিয়ে বীরভূমের জেলা সভাপতি হচ্ছেন। অনুঘটক বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। আগে থেকেই ঋতব্রতদের সঙ্গী কাজল শেখ। বীরভূমের দখল নিয়ে অনুব্রতের সঙ্গে যাঁর আকচাআকচির কথা অজানা নয়। খোদ মমতাও সেই ঝগড়া থামাতে পারেননি। ঋতব্রত পারবেন? রাজ্যে পালাবদলের পরে ক্ষমতার সমীকরণ অবশ্য পাল্টে গিয়েছে। ভাগবাঁটোয়ারারও।
কেষ্ট-কাজল একা নন, তৃণমূলে ‘ঘোষিত শত্রু’ বলে পরিচিত অনেক জুটিই এখন দিদিকে ভাসিয়ে বিদ্রোহী শিবিরে। যুযুধানদের এই সহাবস্থান নিয়েও এখন চর্চা চলছে রাজনৈতিক মহলে। মমতা-ঘনিষ্ঠ এক নেতার কটাক্ষ, ‘‘নিজেদের অর্থ, সম্পদ বাঁচাতে এঁরা এখন পুরনো শত্রুতা ভুলে পাশাপাশি থাকছেন। পুরোটাই ব্যক্তিস্বার্থে।’’ তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “শুভেন্দু অধিকারীর বি টিমে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদেরই তো বিজেপি গরুচোর, কয়লাচোর, পাথরচোর বলত।’’
এটা ঠিক যে, ঋতব্রত শিবিরে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই নানা মামলা। তবে অনুব্রতের শিবির বদলের অন্য কোনও ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। মমতা তো তাঁকে কার্যত আগলে রেখেছিলেন! ২০১৩ সালে পুলিশকে বোম মারার নিদান দিয়েছিলেন কেষ্ট। দিদি কানে তোলেননি। স্নেহের সুরে বলেছিলেন, ওর মাথায় অক্সিজেন কম ঢোকে। সেই কেষ্টর বিরুদ্ধেই গত বছর বোলপুর থানা আইসি-কে ফোনে অকথ্য ভাষায় গালমন্দের অভিযোগ ওঠে। দিদি তখনও নির্বিকার। মমতা-ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায়, “কেষ্টর ও দিকে যাওয়ার নেপথ্যে যেমন মামলা রয়েছে, তেমনই রয়েছে সন্তানস্নেহ। তাঁর মেয়েকে যাতে আর জেলের ভাত খেতে না হয়।”
গরুপাচার মামলায় কেষ্টর মেয়ে সুকন্যাকেও গ্রেফতার করেছিল ইডি। দলের তরফে কুণাল ঘোষ তখন বলেছিলেন, “মা-মরা মেয়েটাকে গ্রেফতার না-করে তদন্ত করা যাচ্ছিল না?” সেই কুণালই এখন বলছেন, “যাঁরা ও দিকে যাচ্ছেন, তাঁদের তিন ধরনের বিষয় রয়েছে। একাংশ যাচ্ছেন লোভে, একাংশ যাচ্ছেন বাঁচতে এবং অন্য অংশ যাচ্ছেন পুলিশ ও প্রশাসনের চাপে।”
কিন্তু কাজলের সঙ্গে কেষ্ট ঘর করতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। কেষ্টর তিহাড়-যাত্রার পরে বীরভূমে তৃণমূল সংগঠনের দখল নেন কাজল। ছাড়া পাওয়ার পরে হারানো জমি আর দখল করতে পারেননি অনুব্রত। কেষ্ট-কাজলের ঝগড়া মেটাতে কোর কমিটি গড়ে দল চালানোর চেষ্টা করেছিলেন মমতা। লাভ হয়নি। দিদির সামনেই ঝগড়া করেছেন দু’জনে। পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতিতে কেষ্ট-কাজল মিটমাট হবে?
প্রশ্ন আরও আছে। ৪ মে দল হারার পর থেকে নিয়ম করে কালীঘাটে যেতেন ডানকুনির নেতা সুদীপ রাহা। অনেকেরই ধারণা ছিল, তৃণমূল ছাত্র পরিষদ সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য যে ভাবে উবে গিয়েছেন, তাতে সুদীপ দায়িত্ব পাবেন। কিন্তু যুব সংগঠন থেকে তুলে এনে চুঁচুড়ার নেত্রী প্রিয়াঙ্কা অধিকারীকে ওই পদে বসিয়ে দেন মমতা।
‘অভিষেকের লোক’ সুদীপ এখন ঋতব্রত শিবিরে, টিএমসিপি সভাপতি। ভোটের পরে অভিষেককে গাল পেড়ে নিলম্বিত হওয়া কোহিনুর মজুমদার চেয়ারম্যান। আড়াই মাস আগেও দু’জনের বনিবনা ছিল না। আপাতত সহাবস্থান। মোচড় আরও আছে। গত মে মাসে কোহিনুরকে যিনি সাসপেন্ড করেছিলেন, সেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এই জুলাইয়ে ঋতব্রত শিবিরের জাতীয় কর্মসমিতির সদস্য।
অনুব্রতের মতো চন্দ্রিমার শিবির বদলও এই সে দিন পর্যন্ত ‘অভাবিত’ ছিল। ৪ মে-র বিপর্যয়ের পরেও চন্দ্রিমা ছিলেন মমতার ছায়াসঙ্গী। দলের রাজ্য সভাপতি হয়েছিলেন এই সে দিন। ফিরহাদ হাকিম থেকে অরূপ বিশ্বাস, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক—উদাহরণ আরও অনেক আছে। এখনও দিদির ‘ভাই’ থেকে যাওয়া নেতার সংখ্যা আক্ষরিক অর্থেই হাতেগোনা। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, সৌগত রায়, ডেরেক ও’ব্রায়েনের পর নাম মনে করতে কসরত করতে হবে। বোনেদের মধ্যে রয়েছেন কেবল মহুয়া মৈত্র এবং দোলা সেন। গত কয়েক দিন ধরে দেখা যাচ্ছে জয়নগরের সাংসদ প্রতিমা মণ্ডলকে। কোহিনুর বলছেন, “এটা হওয়ারই ছিল। আমার কাছে নেত্রী (মমতা) এখনও প্রণম্য। তবে তিনি যদি সত্যিই চাইতেন, আজকে এই অবস্থা হত না।”
নিজের দল ধরে রাখতে পারেননি মমতা। কিন্তু তাঁর দলে থেকে অবিরাম কোন্দল করে যাওয়া অহি-নকুলদের এনে দিয়েছেন এক ছাতার তলায়!