সৌদি আরবের তেলের পাইপলাইনে হামলা এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে হুথি গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি সদ্যসমাপ্ত ব্রিকস সম্মেলনে ছাপ ফেলল। দিল্লি ঘোষণাপত্রে এই ঘটনার অভিঘাত স্পষ্ট বলে মনে করছে কূটনৈতিক শিবির। ঘোষণাপত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর সুরক্ষা, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা, টেঁকসই সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রবাহের উপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সৌদি আরবের তেল পরিকাঠামোয় সঙ্কট তারই প্রতিফলন।
এক দিকে, হরমুজ় প্রণালী দিয়ে উপসাগরীয় জ্বালানি পরিবহণ ইতিমধ্যেই ব্যাহত। অন্য দিকে, হরমুজ় এড়িয়ে সৌদির বিকল্প পথ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ এবং লোহিত সাগর এবং বাব-এল-মান্দেবের নিরাপত্তাও এখন প্রশ্নের মুখে। সব মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার সামনে তৈরি হয়েছে এক গুরুতর ‘ডাবল চোকপয়েন্ট’ সমস্যা।
ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে তাই স্থিতিশীল ও বৈচিত্র্যময় জ্বালানি বাজার, স্থিতিস্থাপক সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামোর সুরক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কূটনতিক শিবির মনে করছে, সৌদি পাইপলাইনে হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, কেন জ্বালানি পরিবহণের বিকল্প ও নিরাপদ পথ তৈরি করা জরুরি। হুথি হুমকি শুধু লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলের সমস্যা নয়। মনে করা হচ্ছে, একই সঙ্গে যদি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামো এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আক্রান্ত হয়, তা হলে ঝুঁকি আর শুধু জাহাজ বা বন্দরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পাইপলাইন, তেল রফতানি পরিকাঠামো এবং সমুদ্রপথ— সবই একই নিরাপত্তা সঙ্কটের অংশ হয়ে ওঠে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে উপসাগরীয় তেলের উপর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। গোটা বিষয়টির সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে দামও বাড়তে পারে।
নয়াদিল্লির বক্তব্য, ব্রিকস ঘোষণাপত্রে ভারতের প্রস্তাবিত নৌ-চালকদের জরুরি ভিত্তিক সহায়তা নেটওয়ার্ক এই পরিস্থিতিতে বাড়তি গুরুত্ব পেল। ঘোষণাপত্রে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য, জ্বালানি প্রবাহ এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতার উপর জোর— বর্তমান সঙ্কটে তাৎপর্যপূর্ণ। বিদেশ মন্ত্রকের মতে, অদূর ভবিষ্যতে লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপথ যখন ক্রমশ চাপের মুখে, তখন ব্রিকসের আলোচনাকে শুধু রাজনৈতিক বিবৃতি বা কূটনৈতিক অবস্থানের মধ্যে আটকে না রেখে, বাস্তবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শিবিরের মতে, ভারতের উপর চাপ আরও বেশি। নয়াদিল্লি তার অপরিশোধিত তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায় এবং উপসাগরীয় জ্বালানি ও সামুদ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে যা গভীর ভাবে সংযুক্ত। ফলে সৌদি পাইপলাইন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা, একই সঙ্গে হরমুজ় প্রণালী এবং বাব-এল-মান্দেবের মাধ্যমে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পরিবহণ ব্যাহত হওয়া— ভারতের জন্য বিপুল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, জাহাজভাড়া ও বিমার খরচ বৃদ্ধি, টাকার উপর চাপ এবং পরিবহণ থেকে শুরু করে বৃহত্তর অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ।