পুজো এলেই সবাই মেতে ওঠে বাঁধনছাড়া আনন্দে। বাচিকশিল্পী-অভিনেতা সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে এখন পুজোর সংজ্ঞা অবশ্য খানিকটা আলাদা।
ছোটবেলায় তাঁর কাছে পুজো মানেই ছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, ঠাকুর দেখা, রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সারা রাত জেগে ঠাকুর দেখতেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁর মায়ের উৎসাহ ছিল প্রবল। সুজয় জানালেন, উত্তর কলকাতায় ঠাকুর দেখতে গেলেই তখন গাড়ি পার্কিং নিয়ে সমস্যা হত। তাঁর বাবা-মায়ের ঝগড়া বেধে যেত উত্তর ভাল না দক্ষিণ, সেই নিয়ে। কারণ মা ছিলেন উত্তর কলকাতার মেয়ে, বাবা ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার। এ সব স্মৃতি আজও তাঁর কাছে খুব কাছের এবং আনন্দের।
সুজয় বলেন, "মা-বাবা চলে যাওয়ার পরে পুজোটা পাল্টে গেল। মানে পুজোর সময়ে আমার প্রিয় খাবারগুলো আর খেতে পারি না। ইচ্ছে করে না, এমনটা বলব না। কিন্তু ইচ্ছে করলেও অনেক সময়ে হয়ে ওঠে না। ষষ্ঠীর দিন মা বাড়িতে গলদা চিংড়ির মালাইকারি বানাত। এখন আর কেউ গলদা চিংড়ির মালাইকারি বানিয়ে দিলেও আমার খেতে ইচ্ছে করে না। তা ছাড়া এখন আমার পুজো পাল্টে গিয়েছে। অনুষ্ঠান আছে পুরো সময়টাই। প্রত্যেক দিনই ব্যস্ত থাকব।”
সুজয়ের স্মৃতির ঝুলি থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে গল্প। তাঁর কথায়, “ছোটবেলার পুজোর আর একটা জিনিস খুব মনে পড়ে। সেটা হল আমার মামার বাড়ি। আমার যে উত্তর কলকাতায় একটা অবস্থান ছিল, শিকড় ছিল, সেটা এখন আর নেই। এটা ভাবতে একটু খারাপ লাগে।” এই খারাপ লাগা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ বছর পুজোয় একটুখানি দেখে আসবেন উত্তর কলকাতায় পুজো।
পুজোর কেনাকাটার প্রসঙ্গে সুজয় বলেন, “পুজোয় কেনাকাটা আলাদা করে কিছু করা হয় না আর। সারা বছর ধরেই তো কিছু না কিছু কিনতে থাকি। এ বার তিনটে জামা বানিয়েছি, আমার অনুষ্ঠানের জন্য লাগবে।”
পুজোয় নিরামিষ বলতে ভোগের খিচুড়ি। তার বাইরে আমিষ খেতেই পছন্দ করেন শিল্পী। মজা করে বললেন, “পুজোয় যদি আমাকে নিরামিষ খেতে হয়, মারা যাব নির্ঘাত। এ সময়ে নিরামিষ নৈব নৈব চ।”
সুজয় জানালেন, পুজোয় কোনও দিনই তেমন ভাবে প্রেম হয়নি তাঁর। আর ইদানীং এ সময়ে যে পরিমাণে ব্যস্ত থাকেন, আলাদা করে প্রেমটা পুজোর জন্য রেখে দেওয়া হয় না। তিনি আরও জানালেন, বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, আড্ডা মারার মতো অভিজ্ঞতা নেই তাঁর। বরং ছোটবেলা থেকেই খুব একা থাকতে ভালোবাসেন। এবং একাকিত্ব নিয়ে কোনও কষ্ট নেই তাঁর। এত ব্যস্ততা আর কাজের মধ্যে তিনি তাই একটু নিঃসঙ্গতা চান। সুজয়ের কথায়, “পুজোয় কোনও অনুষ্ঠান না থাকলে আমি শান্তিনিকেতন চলে যাই। নিজের সঙ্গে একা হওয়ার এই সময়টা খুব পছন্দ করি।”
মা দুর্গার কাছে কী কী বর চান? সুজয় বলেন, “পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ থেমে যাক। সরকার পরিবর্তনের খেলায় বাজার অর্থনীতি যেন মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ না করে। মানুষের জীবনে একটু সারল্য ফিরে আসুক। আর আমি একটু জর্জ ক্লুনি-র সঙ্গে দেখা করতে চাই— এটা যেন হয় এই জীবনে।”
তাঁর কাছে পুজো মানে ছোটবেলার স্মৃতি, বাবা-মা, উত্তর কলকাতার মামাবাড়ি, মায়ের হাতে তৈরি প্রিয় খাবারের স্বাদ ফিরে পাওয়ার ইচ্ছে। আবার নিজের শিকড়ের কাছে ফিরতে চাওয়ার ইচ্ছে। আর অবশ্যই ব্যস্ততার মাঝে একটু সময় পেলে নিজের সঙ্গে সময় কাটানো। এ সব নিয়েই হয়তো এ বছর পুজো কাটাবেন সুজয় প্রসাদ। নিজের মতো করে খুঁজে নেবেন অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোকে।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।