হাওড়া জেলার ছোট্ট গ্রাম মাকড়দহ। মাকড়চণ্ডীর সুপ্রাচীন মন্দিরের নামেই এ গ্রামের নামকরণ। এই মাকড়দহেই একটি উদযাপিত হয় এক অতি প্রাচীন দুর্গাপুজো, যার বয়স ৫০০ বছরেরও বেশি। এলাকার বিখ্যাত জমিদার পরিবার 'চৌধুরী'দের এই পুজোর নেপথ্যে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।
এই পরিবারের প্রাণপুরুষ জনার্দন চৌধুরী প্রথম দুর্গাপুজো করেছিলেন। সেই ধারা আজও বহমান। পরিবারের এক প্রবীণ সদস্যা বেলা চৌধুরী অন্তত তেমনটাই জানাচ্ছেন। অবিভক্ত বাংলার বিক্রমপুর থেকে এই পরিবার এসেছিল এপার বাংলায়। সে সময়ে বর্ধমানের রাজবংশের নায়েব ছিলেন এই পরিবারের পূর্বপুরুষ। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরেরা জায়গিরদার হয়েছিলেন। সে সময়ে একাধিক গ্রামের জমিদারি ছিল চৌধুরীদের ওপর।
চৌধুরী বংশের আগের পদবি ছিল চক্রবর্তী। পরবর্তীতে তারা 'চৌধুরী' হয়। যার নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন মুর্শিদাবাদের নবাব। তেমনটাই জানাচ্ছেন পরিবারের ওই প্রবীণ সদস্যা।
এ বছর এই পরিবারের পুজো ৫০১ বছরে পদার্পণ করল বলে জানিয়েছে পরিবার। এ বাড়ির পুজো শুরু হয় প্রতিপদ থেকে। মাকে পরানো হয় সোনার গয়না। পরিবারের এক প্রবীণ সদস্যা জানালেন, দেবী চণ্ডীর ন’টি রূপের পুজো করা হয়। ৬ দিন চণ্ডীর আরাধনা ও ৩ দিন দেবী দুর্গার আরাধনা হয় পুজোয়। প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা পারিবারিক রীতিনীতি আজও কঠোর ভাবে মানা হয়। ষষ্ঠীর দিন হয় দেবীর চক্ষুদান। তার পরে হয় বোধন। সপ্তমীর দিন থেকে মা দুর্গাকে সাত সমুদ্রের জলে স্নান করানোর রীতি রয়েছে। এ দিন নবপত্রিকা স্নানের পরে পুজো শুরু হয়। নবমীতে হোম শেষ হলে বাড়ির বিধবা মহিলারা অন্ন গ্রহণ করেন। অষ্টমীতে কুমারী পুজো এই বাড়িতে প্রচলিত নয়। তবে কেউ চাইলে তার আয়োজন করা হয় বলে পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত ভোগ নিবেদন করা হয় দেবীকে। সপ্তমী ও অষ্টমীতে কেবল বাড়ির সদস্যদের মধ্যে সেই ভোগ বিতরণ করা হয়। তবে নবমীতে গ্রামের সকলেই আসেন ভোগ খেতে।
বৃহৎ নন্দিকেশ্বর পুরাণ মতে ষোড়শপচারে এই পুজো হয়ে থাকে। শাক্ত মতে পুজো হওয়ার কারণে আজও এই বাড়িতে বলিপ্রথা রয়ে গিয়েছে। এই মাকড়দহ গ্রামের সবথেকে প্রাচীন পুজো এই বাড়ির পুজো। গ্রামের মধ্যে আজও একমাত্র এই বাড়িতেই পাঁঠাবলি হয়। সেই ভোগ বিতরণ করা হয় গ্রামের সকলের মধ্যে। আবার একাদশীতে মাকড়চণ্ডী মন্দিরে পাঁঠাবলি হয়।
এই পুজোকে ঘিরে নানা সময়ে বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে বলে জানালেন পরিবারের সদস্যরা। এক বার এই পুজো হবে না বলেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তার কিছু দিনের মধ্যেই বাড়ির এক সদস্য দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। তার পরেই প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়েছিল। আর এক বার পরিবারের কোনও এক সদস্যা বাড়ির পুজো ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিছুটা পথ গিয়েই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি।
আজও বাংলার বিসর্জনের পুরনো ছবিই ধরা পড়ে চৌধুরী বাড়ির বিসর্জনে। গ্রামের সকলে দেবীকে কাঁধে করে নিয়ে যান বিসর্জনের ঘাটে। দশমীর দিন সকালে বাড়ির ছেলেরা মাকে প্রদক্ষিণ করে। বাড়ির মহিলারা বরণ করেন। ঘাটে প্রথম এই বাড়ির প্রতিমাই বিসর্জন হয়। তার পরে গ্রামের অন্যান্য প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।