শনিবার রাতের মর্মান্তিক ঘটনা বদলে দিয়েছে উৎসবের চেনা ছবিটাই। চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পুজোয় ১৯ জনের মৃত্যু এবং একাধিক দর্শনার্থীর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া গোটা পশ্চিমবঙ্গে। কেউ উৎসবের মরসুমে স্বজন হারানোর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, কেউ আবার প্রার্থনা করছেন আহত আত্মীয়ের সুস্থতার। কী কারণে এই বিপর্যয়, তা নিয়ে নানা মত উঠে আসছে। কেউ দায়ী করছেন অতিবৃষ্টিকে, কেউ প্রশাসনের গাফিলতিকে, কেউ আবার প্রশ্ন তুলছেন চোরবাগান সর্বজনীনের ভূমিকা নিয়ে। তবে ঠিক কোন কারণে এই দুর্ঘটনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নির্দেশ মেনে কলকাতার একাধিক মণ্ডপ গত রাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই তালিকায় ছিল টালা প্রত্যয়ও।
দীর্ঘ ১০০ বছর ধরে কলকাতার পুজোর ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে টালা প্রত্যয়। বিপুল জনসমাগম এবং তার জেরে তৈরি হওয়া সমস্যা সামলানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে পুজো কমিটির। আনন্দবাজার ডট কম-এর তরফে মণ্ডপ বন্ধ রাখার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনেই গত রাতে পুজো বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে রবিবার সকাল ৬টা থেকে ফের খুলে দেওয়া হয়েছে মণ্ডপ। কমিটির দাবি, গত কয়েক দিনের তুলনায় দর্শনার্থীর সংখ্যা এখন অনেকটাই কম।
চোরবাগানের ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন? এ প্রসঙ্গে টালা প্রত্যয়ের কমিটির বক্তব্য, “প্রশাসনের আরও সজাগ হওয়া উচিত ছিল, তবে শুধু তো প্রশাসন নয়, এর দায়বদ্ধতা পুজো কমিটিরও থাকে। ওই মণ্ডপ যেভাবে ভাইরাল হতে শুরু করেছিল সেখানে আরও বেশি পুলিশ এবং নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা উচিত ছিল।”
এ দিকে, সরকারি উদ্যোগে ফের খতিয়ে দেখা হচ্ছে মণ্ডপগুলির প্রবেশ ও বাহিরপথ। মণ্ডপের সঙ্গে আলোর সামঞ্জস্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত আলো রয়েছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করা হচ্ছে। চোরবাগানের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে টালা প্রত্যয়ে না হয়, তা নিশ্চিত করতে কলকাতা পুলিশ ও টালা থানার তরফে তৎপরতা চলছে। রবিবার সকাল থেকে এই মণ্ডপে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যাও।
তবে ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যার কথা তুলে ধরছে টালা প্রত্যয় কমিটি। তাঁদের বক্তব্য, নিজস্বী তোলা এবং ভিডিয়ো করার জন্য দর্শনার্থীরা মণ্ডপের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। ফলে ক্রমশ বাড়তে থাকে ভিড়, আর সেখান থেকেই তৈরি হয় দুর্ঘটনার আশঙ্কা। তাই দর্শনার্থীদের কাছে কমিটির অনুরোধ, মণ্ডপের ছবি তুলতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে সমাজমাধ্যমে তাদের পেজে দেওয়া ছবিগুলি ব্যবহার করুন। কিন্তু সেই অনুরোধ সত্ত্বেও অনেক দর্শনার্থী বার বার দাঁড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ। টালা প্রত্যয়-সহ একাধিক মণ্ডপে ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে যা সমস্যা তৈরি করছে। তা সত্ত্বেও কলকাতা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে টালা প্রত্যয়।
টালা প্রত্যয়ের কাছেই আর জি কর হাসপাতাল। চোরবাগানের ঘটনায় আহত একাধিক দর্শনার্থী সেখানে ভর্তি হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে টালা প্রত্যয়ের কমিটির এক সদস্য বলেন, “এই ঘটনা চোখে দেখা যায় না, পাশেই তো হাসপাতাল তাই দেখতে পাচ্ছি কী দুরবস্থা, পুলিশ কর্মীরাও এসে অনেক ছবি দেখাচ্ছেন। এই অবস্থা ভাল লাগছে না”।
উৎসবের আনন্দের মধ্যেই চোরবাগানের ঘটনা নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে পুজো উদ্যোক্তাদের। মণ্ডপের সৌন্দর্য কিংবা সমাজমাধ্যমে ছবি তোলার আকর্ষণের চেয়েও যে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা জরুরি, সেই বার্তাই দিতে চাইছে টালা প্রত্যয়।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।